শরীরে কোনও লক্ষণ নেই, অথচ ফুসফুসে ক্যানসার! এমনটা কি সম্ভব? হ্যাঁ, ফুসফুসের ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় উপসর্গ ছাড়াই বাড়তে পারে। অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুরের ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে মেয়ে সোহা আলি খানের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এনেছে।
সোহা জানিয়েছেন, অস্ত্রোপচারের সময় টিউমারটি ক্যানসারাস বলে নিশ্চিত হয়। আক্রান্ত অংশ বাদ দেওয়ার পরে কেমোথেরাপিরও প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু রোগের একেবারে গোড়ায় কীভাবে মেলে ক্যানসারের হদিশ? উপসর্গ না থাকলে কোন পরীক্ষায় ধরা পড়তে পারে এই অসুখ? আর কখন অস্ত্রোপচারেই চিকিৎসা সম্পূর্ণ হতে পারে?
কী এই স্টেজ জিরো ক্যানসার?
ক্যানসারের ক্ষেত্রে ‘স্টেজ জিরো’ বলতে সাধারণত এমন একটি প্রাথমিক অবস্থাকে বোঝানো হয়, যেখানে অ্যাবনর্মাল বা অস্বাভাবিক কোষগুলি যে আবরণের মধ্যে তৈরি হয়েছে, তার বাইরে ছড়িয়ে পড়েনি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে অনেক ক্ষেত্রে ‘কার্সিনোমা ইন সিটু’ বলা হয়। অর্থাৎ, কোষে ক্যানসারজনিত পরিবর্তন থাকলেও সেগুলি আশপাশের টিস্যুতে প্রবেশ করেনি।
তবে ফুসফুসের সব ধরনের ক্যানসারের ক্ষেত্রে ‘স্টেজ জিরো’ শব্দটি প্রযোজ্য নয়। ক্যানসারের ধরন, কোষের বৈশিষ্ট্য এবং টিউমারের অবস্থান অনুযায়ী রোগের পর্যায় নির্ধারণ করেন চিকিৎসকেরা। তাই শর্মিলা ঠাকুরের রোগের নির্দিষ্ট পর্যায় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে তাঁর চিকিৎসার বিস্তারিত তথ্য জানা প্রয়োজন।
ক্যানসার রোগ বিশেষজ্ঞদের কথায়, ফুসফুসের ক্যানসারের অন্যতম সমস্যা হল, প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনও স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে রোগী নিজেকে সুস্থ মনে করলেও ফুসফুসে অস্বাভাবিক কোষের বৃদ্ধি চলতে পারে। এই কারণেই অনেক ক্ষেত্রে রোগ ধরা পড়ে দেরিতে।
উপসর্গ ছাড়াই কীভাবে ধরা পড়ে রোগ?
অন্য কোনও কারণে বুকের সিটি স্ক্যান করাতে গিয়ে ফুসফুসে ছোট কোনও লাম্প বা অস্বাভাবিকতা নজরে আসতে পারে। কখনও সেই সূত্র ধরেই চিকিৎসকেরা আরও পরীক্ষার পরামর্শ দেন। তবে ফুসফুসে লাম্প দেখা গেলেই তা ক্যানসার, এমন নয়। আবার সিটি স্ক্যানে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লেও শুধু সেই পরীক্ষার ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া যায় না যে সেটি ক্যানসার কি না।
অস্বাভাবিকতার অবস্থান ও গঠন বিচার করে পরবর্তী পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্রঙ্কোস্কোপি, বায়োপসি বা অস্ত্রোপচার করা হতে পারে। সংগৃহীত টিস্যু পরীক্ষা করে বোঝা যায়, অস্বাভাবিক কোষগুলি নির্দিষ্ট আবরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, নাকি আশপাশের টিস্যুতেও প্রবেশ করেছে। রোগ নির্ণয়ের পাশাপাশি ক্যানসারের পর্যায় নির্ধারণেও এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ, উপসর্গ না থাকলেও কখনও ক্যানসারের সূত্র মিলতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রে রোগের প্রাথমিক পর্যায় শনাক্ত করা সম্ভব নয়। তাই সন্দেহজনক অস্বাভাবিকতা দেখা গেলে তা অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করানো জরুরি।

কখন অস্ত্রোপচারই যথেষ্ট?
ফুসফুসের ক্যানসারের চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের ধরন, পর্যায়, টিউমারের অবস্থান এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার উপর। কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আক্রান্ত অংশ সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া সম্ভব হয়। নির্দিষ্ট কিছু প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যানসারে এর পর কেমোথেরাপির প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে একই চিকিৎসাপদ্ধতি প্রযোজ্য নয়।
কোনও কোনও ক্ষেত্রে ফুসফুসের সামান্য অংশ বাদ দিয়েই অস্ত্রোপচার করা যায়। আবার টিউমারের অবস্থান ও প্রকৃতি অনুযায়ী অন্য পদ্ধতিও বিবেচনা করা হতে পারে। অস্ত্রোপচারের পরে আরও চিকিৎসা প্রয়োজন কি না, তা নির্ভর করে চূড়ান্ত রোগ নির্ণয়, টিস্যু পরীক্ষার ফল এবং ক্যানসার ফিরে আসার আশঙ্কা-সহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর।
ফুসফুসে লাম্প দেখা গেলেই অস্ত্রোপচার করতে হবে, এমনও নয়। কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় অন্তর স্ক্যান করে নজর রাখা হয়। কোথাও আবার রোগের প্রকৃতি বুঝতে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন হয়। তাই রিপোর্টের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন ছাড়া চিকিৎসা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

কারা করাবেন ফুসফুসের ক্যানসার স্ক্রিনিং?
ফুসফুসের ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে নির্দিষ্ট উচ্চঝুঁকির মানুষের ক্ষেত্রে লো-ডোজ সিটি স্ক্যান স্ক্রিনিংয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়। বিশেষত যাঁদের দীর্ঘদিন ধূমপানের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা উপকারী হতে পারে। তবে সকলের জন্য নিয়মিত এই পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন নেই। বয়স, ধূমপানের ইতিহাস এবং অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসক ঠিক করেন কার স্ক্রিনিং প্রয়োজন।
ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং পরোক্ষ ধূমপান থেকে দূরে থাকাও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের কাশি, কাশির সঙ্গে রক্ত পড়া, শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনও অস্বাভাবিক শ্বাসযন্ত্রের উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তবে এই উপসর্গগুলি থাকলেই ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়। একই ভাবে, উপসর্গ না থাকলেও রোগ সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া যায় না।
শর্মিলা ঠাকুরের অসুস্থতার খবর ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দেয়, শরীর সুস্থ লাগা মানেই সব ক্ষেত্রে রোগের সম্ভাবনা নেই, এমন নয়। তবে আগেভাগে রোগ শনাক্ত করার জন্য সকলের সিটি স্ক্যান করানোও সমাধান নয়। কার স্ক্রিনিং প্রয়োজন, কোন অস্বাভাবিকতায় আরও পরীক্ষা জরুরি এবং কখন চিকিৎসা শুরু করতে হবে, তা নির্ধারণ করাই আসল। সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসার সুযোগ বাড়ে।
