গ্রামীণ টেলিকমের কাছ থেকে পাওয়া অর্থকে লভ্যাংশ হিসেবে দেখিয়ে সরকারকে ন্যায্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করতে ‘চেষ্টার কমতি রাখেনি’ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের গ্রামীণ কল্যাণ—এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আদালত বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটির এ কর্মকাণ্ড কর ফাঁকির ‘ধ্রুপদী নজির’। পাঁচ করবর্ষে প্রায় ৬৬৭ কোটি টাকার বকেয়া কর আদায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন আদালত।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে হাইকোর্টের দুটি মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গ্রামীণ কল্যাণের করা পৃথক দুটি রিট খারিজ করে রায় দেন।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত বলেন, গ্রামীণ কল্যাণ গ্রামীণফোনের কোনো শেয়ারহোল্ডার নয়। ফলে গ্রামীণ টেলিকমের কাছ থেকে পাওয়া অর্থকে লভ্যাংশ হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই। চুক্তির আওতায় পাওয়া অর্থকে অন্যান্য খাতের আয় হিসেবে বিবেচনা করে সাধারণ হারে কর আরোপ করা আইনসম্মত।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আবদুস সামাদ আজাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষ পর্যন্ত পাঁচ বছরে গ্রামীণ কল্যাণের কাছে মোট ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা কর দাবি করা হয়েছে। পুনর্মূল্যায়নের পর কর কর্তৃপক্ষের নির্ধারণ করা এ করদাবির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে প্রতিষ্ঠানটি হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট করেছিল।
রায়ে আদালত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে বকেয়া কর আদায়ে ডিমান্ড নোটিশ জারি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে এ বিষয়ে দেওয়া স্থগিতাদেশও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১১ সালের ১৩ এপ্রিল গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের মধ্যে একটি ইক্যুইটি পার্টিসিপেশন এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির দ্বিতীয় শর্ত অনুযায়ী, গ্রামীণ কল্যাণ গ্রামীণফোনের কোনো শেয়ার দাবি করতে পারবে না।
তবে গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে চুক্তির আওতায় গ্রামীণফোনে বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফার ৪২ দশমিক ৬৫ শতাংশ পেত গ্রামীণ কল্যাণ। এই অর্থ লভ্যাংশ হিসেবে দেখিয়ে কর সুবিধা নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে কর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বিরোধ তৈরি হয়।
কর কর্তৃপক্ষের মতে, ওই অর্থ লভ্যাংশ নয়; বরং অন্যান্য উৎস থেকে আয়। ফলে এ অর্থের ওপর সাধারণ হারে কর প্রযোজ্য। অন্যদিকে, গ্রামীণ কল্যাণের দাবি ছিল, বিনিয়োগের বিপরীতে পাওয়া অর্থের কর আগেই পরিশোধ করা হয়েছে। নতুন করে কর আরোপ করা হলে দ্বৈত করের পরিস্থিতি তৈরি হবে।
তবে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, গ্রামীণ টেলিকমের দেওয়া অর্থের ওপর গ্রামীণ কল্যাণের নামে উৎসে কর কর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে প্রতিষ্ঠানটির নামে সরকারি কোষাগারে কর জমা দেওয়ার বৈধ চালানও পাওয়া যায়নি। গ্রামীণ টেলিকমের নামে থাকা চালান দেখিয়ে গ্রামীণ কল্যাণ নিজেদের কর পরিশোধের দাবি করতে পারে না।
রায়ে ২০১৭-১৮ করবর্ষের একটি মামলার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন আদালত। ওই করবর্ষে কর কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট অর্থকে অন্যান্য খাতের আয় হিসেবে বিবেচনা করেছিল। এর বিরুদ্ধে গ্রামীণ কল্যাণ হাইকোর্টে রেফারেন্স মামলা করলেও পরে তা আর পরিচালনা না করার আবেদন করে। ২০২৩ সালের ৯ নভেম্বর মামলাটি খারিজ হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, ২০১৭-১৮ করবর্ষে ওই আয়কে অন্যান্য খাতের আয় হিসেবে মেনে নেওয়ার পরও আগের করবর্ষগুলোর কর দিতে না চাওয়ার বিষয়টি সাংঘর্ষিক। নথিপত্র ও প্রতিষ্ঠিত আইনি নীতির আলোকে গ্রামীণ কল্যাণের দাবির পক্ষে দাঁড়ানোর মতো কোনো যুক্তি নেই বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত বলেন, গ্রামীণ কল্যাণ মীমাংসিত একটি বিষয় দীর্ঘায়িত করে সরকারকে ন্যায্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করতে চেষ্টার কোনো কমতি রাখেনি। আদালত এ কর্মকাণ্ডকে কর ফাঁকির ধ্রুপদী উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
আপিল করবে গ্রামীণ কল্যাণ
হাইকোর্টের রায়ের পর তা স্থগিত চেয়ে আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন গ্রামীণ কল্যাণের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, রায়ের প্রত্যায়িত অনুলিপির জন্য আবেদন করা হয়েছে। অনুলিপি পাওয়ার পর আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন (লিভ টু আপিল) করা হবে।
তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আবদুস সামাদ আজাদ জানিয়েছেন, হাইকোর্টের রায়ের প্রত্যায়িত অনুলিপি পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী বকেয়া কর আদায়ের জন্য নোটিশ জারি করবে।
উল্লেখ্য, গ্রামীণ কল্যাণ ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠান। সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা এবং তিনি এর সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দারিদ্র্য নিরসনের লক্ষ্যে কাজ করে বলে তাদের ওয়েবসাইটে উল্লেখ রয়েছে।
