চলছে উৎসবের মরশুম। উৎসব মানেই জমিয়ে খাওয়াদাওয়া, রাত জেগে আড্ডা, দেদার ঘোরাঘুরি আর আনন্দে মেতে ওঠা। কিন্তু এই ব্যস্ততার মধ্যেই অজান্তে বাড়তে পারে হৃদযন্ত্রের সমস্যা। অনিয়মিত ঘুম, অতিরিক্ত নুন-চিনিযুক্ত খাবার, শারীরিক পরিশ্রম এবং মানসিক উত্তেজনা, সব মিলিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকির কারণগুলি একসঙ্গে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষত যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা আগে থেকেই হৃদরোগের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সব সময় তীব্র বুকে ব্যথা দিয়ে শুরু হয় না। কখনও চোয়ালে ব্যথা, ঘাম বা আচমকা দুর্বলতাও হতে পারে বিপদের সংকেত। উৎসবের ব্যস্ততায় এই লক্ষণগুলিকে অবহেলা করলেই বিপদ বাড়তে পারে।
বুকে ব্যথা ছাড়াও বিপদের ইঙ্গিত
হার্ট অ্যাটাক হলেই বুকে অসহ্য যন্ত্রণা হবে, এমনটা নয়। অনেকের ক্ষেত্রে বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী ভাব বা অস্বস্তি দেখা দেয়। আবার কারও ক্ষেত্রে লক্ষণগুলি হয় তুলনামূলক মৃদু, যা সহজেই অন্য সমস্যার সঙ্গে গুলিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে মহিলা, প্রবীণ এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে উপসর্গের ধরন আলাদা হতে পারে।
চোয়াল, ঘাড়, পিঠ বা বাঁ হাতে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া, আচমকা বমি বমি ভাব, ঘাম, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা কোনও কারণ ছাড়াই প্রবল ক্লান্তি, এগুলির কোনওটিই অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষত একাধিক লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দিলে সতর্ক হতে হবে। আগে থেকে হৃদরোগের সমস্যা থাকলে নতুন করে দেখা দেওয়া এমন উপসর্গকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
অম্বল ভেবে সময় নষ্ট নয়
উৎসবের মরশুমে হার্ট অ্যাটাকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক-সংকেতকে অনেকেই ভুল করে অ্যাসিডিটি বলে ধরে নেন। ভারী খাবার খাওয়ার পর বুক জ্বালা, পেটের উপরের অংশে অস্বস্তি বা বমি বমি ভাব হলে অনেকেরই প্রথমে গ্যাসের কথা মনে হয়। অ্যান্টাসিড খেয়ে অপেক্ষা করেন, কখন সমস্যা কমবে।
কিন্তু হৃদযন্ত্রে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হলেও বুকের মাঝখানে বা পেটের উপরের অংশে অস্বস্তি হতে পারে। সেই অস্বস্তি হাত, চোয়াল, পিঠ বা ঘাড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সঙ্গে ঘাম, শ্বাসকষ্ট বা মাথা ঘোরার মতো লক্ষণ থাকলে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক।
শুধু ব্যথার ধরন দেখে অ্যাসিডিটি ও হার্ট অ্যাটাকের মধ্যে নিশ্চিতভাবে পার্থক্য করা যায় না। অ্যান্টাসিড খেয়ে অস্বস্তি কমল কি না, তা দেখার জন্যও অপেক্ষা করা উচিত নয়। হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহ হলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা দরকার।

উৎসবেই কেন বাড়তি সতর্কতা?
অতিরিক্ত নুনযুক্ত খাবার রক্তচাপ বাড়াতে পারে এবং শরীরে জল জমার প্রবণতা বাড়াতে পারে। অতিরিক্ত মদ্যপান রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দনে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্য দিকে, রাত জাগা ও ঘুমের ঘাটতি শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত করে। তার সঙ্গে যদি যোগ হয় দীর্ঘক্ষণ হাঁটাহাঁটি, একটানা দাঁড়িয়ে থাকা, অতিরিক্ত নাচানাচি বা ক্লান্ত শরীরে বিশ্রাম না নেওয়ার অভ্যাস, তা হলে হৃদযন্ত্রের উপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে।
এই কারণগুলি সবার ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক ঘটাবে, এমন নয়। তবে আগে থেকে করোনারি আর্টারি ডিজিজ, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস থাকলে ঝুঁকির বিষয়গুলি অবহেলা করা ঠিক নয়। উৎসবের আনন্দে নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতা ভুলে যাওয়াও বিপজ্জনক হতে পারে।

ওষুধে বিরতি নয়
উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের সমস্যা থাকলে উৎসবের মধ্যেও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়ার নিয়ম বজায় রাখতে হবে। নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ করা বা ডোজ পরিবর্তন করা চলবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রাও পরীক্ষা করতে হবে।
তবে সব সতর্কতার পরেও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। তাই লক্ষণ চিনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত চিকিৎসা শুরু হলে হৃদযন্ত্রের পেশির ক্ষতি কমানোর সুযোগ বাড়ে।মনে রাখবেন, হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
