আমাদের দেশে দূরপাল্লার বাসে যাতায়াতের সময় ধর্মপ্রাণ সাধারণ যাত্রীদের প্রায়ই এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। যাত্রাপথে সালাতের ওয়াক্ত হয়ে গেছে, অথচ চালক বাস থামাচ্ছেন না; আবার অনেক সময় যাত্রীর সাথে ওজু করার মতো পানি বা সুযোগও থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে সালাতের নির্দিষ্ট ওয়াক্ত অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় একদিকে ঈমানি ব্যাকুলতা, অন্যদিকে পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতা—সব মিলিয়ে সাধারণ যাত্রীরা এক বড় দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান।
ওজু না থাকলে কিংবা বাস না থামলে চলন্ত বাসে তায়াম্মুম করে নামাজ পড়া যাবে কি না এবং এর পরবর্তী বিধান কী—এ নিয়ে মানুষের মধ্যে স্পষ্ট জানার আগ্রহ রয়েছে।
এই বাস্তবসম্মত দৈনন্দিন সমস্যার একটি চমৎকার ও শরিয়াহসম্মত সমাধান তুলে ধরেছেন বিশিষ্ট ইসলামী স্কলার মুফতি রেজাউল কারীম আবরার।
ফিকহের নির্ভরযোগ্য শাস্ত্রীয় গ্রন্থের নজীর উল্লেখ করে তিনি সফরকালীন ওজরের সময় সালাত আদায়ের সঠিক পদ্ধতি এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর পর তা পুনরায় আদায়ের বিধান সুস্পষ্ট করেছেন।
তিনি বলেন, বাসে ভ্রমণকালে যদি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে বাস থামানো হচ্ছে না এবং ওজু করার মতো সুযোগ বা পানি নেই, তবে সালাতের ওয়াক্ত রক্ষা করার জন্য যাত্রী তায়াম্মুম করে নামাজ আদায় করে নেবেন। ওজরের সময় ওয়াক্ত পার না করে যে অবস্থায় সম্ভব সেভাবেই নামাজ পড়ে ফেলা শরিয়াহর নির্দেশনা।
চলন্ত বাসে ইশারায় বা অবতীর্ণ অবস্থায় নামাজ আদায়ের বিষয়ে ফিকহি ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রেজাউল কারীম আবরার ফিকহের সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘আল-বাহরুর রায়েক’-এর একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তও তুলে ধরেছেন:
- বন্দি ব্যক্তির সালাতের দৃষ্টান্ত: যদি কোনো মুসলিম শত্রুর হাতে বন্দি হন এবং শত্রুপক্ষ বা কাফেররা তাকে ওজু করতে কিংবা স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতে না দেয়; তবে শরিয়তের বিধান হলো, তিনি ইশারার মাধ্যমে হলেও ওয়াক্তের মধ্যে সালাত আদায় করবেন।
- মুক্তিলাভের পর করণীয়: পরবর্তীতে শত্রু বা কাফেরের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে যখন তিনি স্বাভাবিক পরিবেশ পাবেন, তখন ওই বন্দিদশায় পঠিত সালাত পুনরায় আদায় (কাজা) করে নেবেন।
বাসের বিশেষ পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও একই শরঈ নীতি প্রযোজ্য বলে জানিয়েছেন মুফতি আবরার। অর্থাৎ, বাধ্যবাধকতার কারণে বাসে অবতীর্ণ অবস্থায় তায়াম্মুম করে বা ইশারায় সালাত আদায় করতে হবে।
বাস থেকে নামার পর সালাত পুনরায় পড়ার বিধান
বাসে তায়াম্মুম করে সালাত আদায় করার পর যাত্রীর দায়িত্ব সেখানেই শেষ হয়ে যায় না। রেজাউল কারীম আবরার স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, যাত্রী যখন বাসের যাত্রা শেষ করে গন্তব্যে নামবেন এবং ওজু করার উপযুক্ত পরিবেশ ও পানি পাবেন, তখন বাসে পড়া ওই সালাতটি তাঁকে বাধ্যতামূলকভাবে পুনরায় পড়ে নিতে হবে। অর্থাৎ বাসের ওজরকালীন সালাতটি কেবল ওয়াক্তের হুকুম রক্ষার জন্য পড়া হয়েছিল; তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর তা পুনরায় আদায় করা আবশ্যক।
