চিত্রনায়ক আমিন খান। নব্বইয়ের দশক থেকে ঢাকাই চলচ্চিত্রে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন তিনি। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন এই অভিনেতা। তবে একটি সিনেমার শুটিংয়ে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্ঘটনা আজও তার জীবনের দুঃসহ স্মৃতি। ‘জ্যান্ত কবর’ সিনেমার শুটিং করতে গিয়ে পেট্রোল বোমার আগুনে গুরুতর দগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। অবস্থা এতটাই গুরুতর ছিল যে, বেঁচে ফেরা নিয়ে তৈরি হয়েছিল শঙ্কা। পরে হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিতে হয়েছিল তাকে।
সম্প্রতি মাছরাঙ্গা টিভির এক অনুষ্ঠানে সেই দুর্ঘটনার স্মৃতিচারণা করেন আমিন খান। তিনি জানান, সিনেমাটির শুটিং হয়েছিল গাজীপুরের একটি শুটিং হাউসে। সিনেমার শেষ দৃশ্যের শুটিং চলছিল। ওই দৃশ্যে তার পেছনে একের পর এক পেট্রোল বোমা বিস্ফোরিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শুটিংয়ের সময় ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
আমিন খান বলেন, ‘একটি সিকোয়েন্স ছিল এমন—মাটিতে ছয়-সাতটি পেট্রোল বোমা রাখা ছিল। প্রতিটিতে প্রায় ৩০ লিটার করে পেট্রোল দেওয়া ছিল। আমি সেগুলোর মাঝখান দিয়ে দৌড়ে আসব, আর আমার পেছনে একের পর এক বোমা বিস্ফোরিত হবে। প্রায় ১০০ মিটার দূরত্বের মধ্যে আমাকে দৌড়াতে হতো। ক্যামেরা, অ্যাকশন বলার পর দৌড় শুরু করলাম। প্রথমে আমার পেছনের বোমাটি বিস্ফোরিত হয়। এরপর হঠাৎ আমার সামনে ও চারপাশের প্রায় আটটি বোমা একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়ে যায়।’
দুর্ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরে এই অভিনেতা বলেন, ‘বোমাগুলো বিস্ফোরিত হয়ে পুরো আগুন আমার শরীরের ওপর পড়ে। আমার সারা শরীরে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল। চুলসহ শরীরের অনেক অংশ পুড়ে গিয়েছিল। চেহারার সামনের অংশের চামড়া পুড়ে গোলাকার হয়ে গিয়েছিল। গলার নিচে, পিঠে ও হাতেও এখনো সেই পোড়ার দাগ রয়েছে।’ সেই সময়ের পরিস্থিতি বর্ণনা করে আমিন খান জানান, দুর্ঘটনার পর সবাই ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো আর বাঁচবেন না।
শরীরে আগুন নিয়ে ক্যামেরার নির্ধারিত জায়গা পার হয়ে দৌড়ে একটি কক্ষে ঢুকে পড়েন তিনি। সেখানে গড়াগড়ি দিয়ে নিজের শরীরের আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। এরপর চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখেন, পুরো মুখ পুড়ে কালো হয়ে গেছে। দুর্ঘটনার পর ঢাকায় এসে হাসপাতালে ভর্তি হন এই অভিনেতা। তার চিকিৎসায় বাংলাদেশের তৎকালীন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেন। প্রায় দুই থেকে আড়াই মাস তাকে আলাদা কক্ষে রাখা হয়েছিল, যাতে সংক্রমণের ঝুঁকি কম থাকে এবং মুখে নতুন করে কোনো দাগ না পড়ে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৩ সালে মোহাম্মদ হোসেন পরিচালিত ‘সনি কথাচিত্র’ প্রযোজিত ‘অবুঝ দুটি মন’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্র তার অভিষেক হয়। এর আগে ১৯৯০ সালে ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ আমিন খানের চাচা (প্রয়াত) আবু হাসান খানের অনুপ্রেরণায় এই প্রতিযোগিতায় নিজের নাম লেখান। ১৯৯২ সালের ২৪ ডিসেম্বর আমিন খানের জন্মদিনে তার প্রথম চলচ্চিত্রের শুটিং শুরু হয়েছিল। শেষ হয় ১৯৯৩ সালের ২৯ জুলাই।
১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর সারা দেশের ৮০টি সিনেমা হলে ‘অবুঝ দুটি মন’ মুক্তি পেয়েছিল। ‘অবুঝ দুটি মন’ মুক্তির আগেই আমিন খান বাদল খন্দকারের ‘দুনিয়ার বাদশা’ চলচ্চিত্রে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। তার তৃতীয় চলচ্চিত্র এফ আই মানিকের ‘বীর সন্তান’। প্রথম চলচ্চিত্রে তার নায়িকা ছিল চাঁদনী। আমিন খানের প্রথম চলচ্চিত্রের ‘স্বর্গ হতে এই জগতে তুমি এসেছো আমি এসেছি’ গানটি সে সময় দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করে।
আমিন খানে উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে- ‘ফুল নেবো না অশ্রু নেবো’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘বীর সন্তান’, ‘বাংলার কমান্ডো’, ‘হৃদয় আমার’, ‘হীরা চুনি পান্না’, ‘পিতার আসন’, ‘হৃদয়ের বন্ধন’ ইত্যাদি।
চলচ্চিত্র জীবনে এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। আমিন খান সমসাময়িক শাবনাজ, শাবনূর, মৌসুমী, পপি, পূর্ণিমা, চম্পা, শিল্পী, ঋতুপর্ণা, শাহনাজ, একা, সিমলা, মনিকা বেদী, সাহারা, নিপুণ, অপু বিশ্বাসসহ প্রায় সব নায়িকাদের সঙ্গেই কাজ করেছেন।
