আমাদের সমাজ ও ধর্মীয় পরিমণ্ডলে কিছু শব্দ এবং ধারণা এত গভীরভাবে গেঁথে গেছে যে, সেগুলোর মূল উৎস বা প্রকৃত অর্থ নিয়ে আমরা খুব কমই ভাবি। এমনই একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ হলো ‘আকাবির’।
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
আমাদের সমাজ ও ধর্মীয় পরিমণ্ডলে কিছু শব্দ এবং ধারণা এত গভীরভাবে গেঁথে গেছে যে, সেগুলোর মূল উৎস বা প্রকৃত অর্থ নিয়ে আমরা খুব কমই ভাবি। এমনই একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ হলো ‘আকাবির’। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের কওমি মাদ্রাসা ও ইসলামি অঙ্গনে শীর্ষস্থানীয়, শ্রদ্ধেয় আলেম-উলামা এবং পূর্বসূরি মুরুব্বিদের বোঝাতে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে এই 'আকাবির' শব্দটি ব্যবহার করা হয়। তবে শব্দটির ভাষাগত উৎস, কুরআনিক প্রয়োগ এবং এর সাথে জড়িয়ে থাকা অন্ধভক্তির মনস্তত্ত্ব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এক ভিন্ন ঐতিহাসিক বাস্তবতা উন্মোচিত হয়।
শাব্দিক উৎস ও প্রচলিত ধারণা
ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে ‘আকাবির’ (أكابر) হলো আরবি শব্দ 'আকবার' (أكبر)-এর বহুবচন, যার অর্থ সবচেয়ে বড় বা মহান ব্যক্তিবর্গ। আরবি 'কুবর' (كبر) ধাতু থেকে এর উৎপত্তি। প্রচলিত পরিভাষায় এটি বড় আলেম বা ধর্মীয় মুরুব্বিদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলেও, ধারণাগতভাবে এই 'আকাবির প্রীতি' বা বড়দের অন্ধ অনুকরণের ইতিহাস কিন্তু নতুন নয়। এর মূল উৎস খুঁজতে আমাদের ফিরে যেতে হবে আরবের প্রাক-ইসলামি বা জাহেলি সমাজে।
মক্কার কুরাইশদের আকিদা: তারা নাস্তিক ছিল না
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে মক্কার কুরাইশদের বিরোধিতার জায়গাটি বুঝতে হলে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস জানা প্রয়োজন। মক্কার কুরাইশরা কিন্তু নাস্তিক বা ঈশ্বর-অবিশ্বাসী ছিল না। তারা মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে 'আল্লাহ'কে বিশ্বাস করত। তারা কথায় কথায় আল্লাহর নামে কসম করত। এমনকি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতের বিরোধিতা করার সময়ও তারা আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলত যে, তারা যা করছে তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করছে।
পবিত্র কুরআনে কুরাইশদের এই বিশ্বাসের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা আল-আনকাবূতের ৬১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন:
“যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছে এবং সূর্য ও চন্দ্রকে নিয়োজিত করেছে? তারা অবশ্যই বলবে—আল্লাহ।”
তবে তাদের মূল সমস্যা ছিল 'শিরক' বা অংশীদারিত্ব এবং ‘আকাবির পূজা’। তারা বিশ্বাস করত, আল্লাহ অনেক উঁচুতে থাকেন, তাই সরাসরি তাঁর কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়। আল্লাহর কাছে সুপারিশ করার জন্য তাদের ‘আকাবির’ বা পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া দেব-দেবী (যেমন: লাত, ওজ্জা, মানাত) প্রয়োজন। অর্থাৎ, তারা আল্লাহর অস্তিত্ব মানত, কিন্তু ইবাদতের ক্ষেত্রে তাদের বাপ-দাদার প্রবর্তিত মূর্তিরূপী আকাবিরদের অন্ধ অনুকরণ করত।
আবু তালিবের দরবারে কুরাইশদের অভিযোগ: আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সাথে কুরাইশদের বিরোধের মূল কারণ ছিল—তিনি এই মনগড়া 'আকাবির প্রথা' এবং তাদের অন্ধ অনুকরণের সরাসরি বিরোধিতা করেছিলেন। সীরাতের কিতাবগুলোতে দেখা যায়, কুরাইশদের শীর্ষ নেতারা (আবু জেহেল, উতবা, শায়বা, ওয়ালিদ বিন মুগিরা প্রমুখ) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা আবু তালিবের কাছে একাধিকবার প্রতিনিধি দল নিয়ে হাজির হয়েছিল।
আবু তালিবের কাছে গিয়ে কুরাইশদের মূল অভিযোগ কিন্তু এটি ছিল না যে মুহাম্মদ (সা.) নতুন কোনো ঈশ্বরের কথা বলছেন। বরং তাদের প্রধান অভিযোগ ছিল: “আপনার ভাতিজা আমাদের পূর্বপুরুষদের (আকাবিরদের) ধর্মবিশ্বাসের নিন্দা করছে, আমাদের পূর্বসূরিদের বোকা বানreflection (অপমান) করছে এবং আমাদের দেব-দেবীদের সমালোচনা করছে”। তারা আবু তালিবকে চাপ দিচ্ছিল যেন তিনি তাঁর ভাতিজাকে থামান, কারণ মুহাম্মদ (সা.) তাদের শত বছরের ঐতিহ্য ও আকাবিরদের অন্ধ অনুকরণের দেওয়ালে আঘাত হেনেছিলেন।
জাহেলি যুগের এই অন্ধ অনুসারীরা তাদের নেতাদের উস্কানিতে আল্লাহর রাসুলের প্রতি তীব্র অন্ধবিদ্বেষ পোষণ করত, ঠিক যেমন বর্তমান যুগের অন্ধ ভক্তরা তাদের 'আকাবির' বা মুরুব্বিদের উস্কানিতে অন্যের প্রতি অন্ধ বিদ্বেষ ছড়ায়।
কুরআনুল কারীমে 'আকাবির' শব্দটিকে মহান আল্লাহ কোনো পজিটিভ বা ইতিবাচক অর্থে ব্যবহার করেননি। বরং এটিকে অপরাধীদের গডফাদার বা পাপাচারের সর্দার অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। সূরা আল-আনআমের ১২৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَا فِى كُلِّ قَرْيَةٍ أَكَٰبِرَ مُجْرِمِيهَا لِيَمْكُرُوا۟ فِيهَا...
অর্থ: “আর এমনিভাবে আমি প্রত্যেক জনপদে অপরাধীদের জন্য কিছু সর্দার (আকাবির) নিয়োগ করেছি—যেন তারা সেখানে চক্রান্ত করে...”
শুধু তাই নয়, একই মূল অক্ষর থেকে আসা এই শব্দের প্রতিশব্দ ‘কুবারা’ (كُبَرَاء) শব্দটিও কুরআনে নেতিবাচকভাবে এসেছে। সূরা আল-আহযাবের ৬৭ নম্বর আয়াতে কিয়ামতের ময়দানে পথভ্রষ্ট মানুষের আক্ষেপ তুলে ধরে বলা হয়েছে:
وَقَالُوا۟ رَبَّنَآ إِنَّآ أَطَعْنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَآءَنَا فَأَضَلُّونَا ٱلسَّبِيلَا۠
অর্থ: “তারা আরও বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা আমাদের নেতা ও বড়দের (কুবারা) কথা মেনেছিলাম, অতঃপর তারা আমাদের পথভ্রষ্ট করেছিল।”
ভুলভ্রান্তির ঊর্ধ্বে নন কেউ: ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, আম্বিয়া আলাইহিস সালাম ছাড়া পৃথিবীর কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে বা 'মাসুম' নন। আমাদের পূর্বসূরি বা বর্তমানের বড় আলেমরাও মানুষ এবং তাদেরও ভুল হতে পারে। তাই তাদের যেকোনো বক্তব্য বা কাজকে অন্ধভাবে লুফে না নিয়ে কুরআন ও সুন্নাহর দলিলের আলোকে যাচাই করা প্রগতিশীল ঈমানের দাবি।
কারো প্রতি অন্ধ ভক্তি বা অন্ধ বিদ্বেষ—দুটিই চরম বিপজ্জনক। কোনো মানুষের চিন্তার দাসত্ব করা বা তাকে অভ্রান্ত মনে করা প্রকারান্তরে তার গোলামি করার শামিল, যা কেবল মহান রাব্বুল আলামিনের জন্যই প্রযোজ্য। এ কারণে ব্যক্তির অন্ধ অনুকরণ বা আকাবির পূজা মূলত জাহিলিয়াতেরই একটি অংশ।
উপসংহার: কুরআনের মুক্তচিন্তার আহ্বান
ইসলাম মানুষকে অন্ধত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে চিন্তার দুয়ার খুলে দেয়। পবিত্র কুরআনে প্রায় ৭৫০টিরও বেশি আয়াতে মানুষকে চিন্তা, গবেষণা, বুদ্ধির প্রয়োগ এবং পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা সূরা মুহাম্মদের ২৪ নম্বর আয়াতে প্রশ্ন তুলেছেন:
“তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করে না? নাকি তাদের হৃদয়সমূহে তালা ঝুলানো রয়েছে?”
অতএব, পূর্বসূরি বা আলেমদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা অবশ্যই প্রশংসনীয় ও ইসলামি শিষ্টাচার, কিন্তু সেই সম্মান যেন অন্ধ ভক্তিতে রূপ নিয়ে আমাদের বিবেকের দুয়ার বন্ধ না করে দেয়। কুরাইশরা যেভাবে আল্লাহকে মেনেও তাদের 'আকাবিরদের' মধ্যস্থতাকারী বানিয়ে পথভ্রষ্ট হয়েছিল, আমাদের সাবধান থাকতে হবে যেন আমরাও কোনো ব্যক্তির ভক্তি প্রকাশ করতে গিয়ে কুরআনের শাশ্বত তাওহীদ ও মুক্তচিন্তার পথ থেকে বিচ্যুত না হই। কুরআন ও সুন্নাহকে চূড়ান্ত মাপকাঠি ধরে মুক্তবুদ্ধি ও গবেষণার চর্চাই হোক একজন প্রকৃত মুমিনের পথ।
