সাইফুল ইসলাম, পটিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের পটিয়ার প্রধান প্রধান সড়ক ও অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে লাইসেন্সবিহীন যানবাহনের দাপট দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কোনো অনুমোদন কিংবা বৈধ কাগজপত্র না থাকলেও নিয়মিত ‘মাসিক চাঁদা’ এবং গোপন তালিকার জোরে মহাসড়কে অবাধে চলাচল করছে এসব বেআইনি যানবাহন। পরিবহন চালক ও স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা পরিশোধের মাধ্যমে প্রাপ্ত টোকেন কিংবা খাতায় নাম তোলাই এখন পটিয়ায় অবৈধ যানবাহন চলাচলের 'বৈধ সনদ'।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়,
পটিয়ার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ও উপজেলার বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সড়ক ঘুরে দেখা যায়, নিবন্ধনহীন সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও লেগুনা বেপরোয়াভাবে চলাচল করছে। এসব যানবাহনের অধিকাংশেরই কোনো বৈধ কাগজপত্র, ফিটনেস সনদ কিংবা চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। কিন্তু স্থানীয় চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট ও নির্দিষ্ট কিছু প্রভাবশালী চক্রকে মাসিক চাঁদা দিয়ে এরা নির্বিঘ্নে গাড়ি চালাচ্ছে।
উপজেলার বাস স্টেশন, ডাকবাংলো, আমজুরহাট, বাদামতল ও শান্তিরহাটের মতো ব্যস্ততম এলাকাগুলো থেকে মূলত এই চাঁদা তোলা হয়।
বিভিন্ন পরিবহন স্টেশন ও সমিতি সূত্রে জানা গেছে, পটিয়ার বিভিন্ন রোডে বর্তমানে আনুমানিক ১,৬৫০টিরও বেশি সিএনজি অটোরিকশা এবং প্রায় ৬০টি লেগুনা নিয়মিত চলাচল করছে।
এই বিশাল পরিবহন বহর থেকে চাঁদা আদায়ে সক্রিয় রয়েছে শক্তিশালী এক সিন্ডিকেট। রুটভেদে এই সিন্ডিকেট পরিচালনায় জড়িত নির্দিষ্ট কিছু প্রভাবশালী মুখ:
বদিউল আলম বদি: হাইদগাঁও, কেলিশহর, ধলঘাট, মুড়ালি, চামুদরিয়া, আলির হাট ও বাস স্ট্যান্ড এলাকা।
ফোরকান: বাদামতল থেকে বোয়ালখালী রোড।
সাদ্দাম: বাদামতল থেকে পটিয়া রোড।
এনাম: আমজুরহাট থেকে পটিয়া রোড।
করিম (সভাপতি) ও সোলাইমান (সেক্রেটারি): শান্তিরহাট সিএনজি লাইন (শান্তিরহাট থেকে পটিয়া রোডসহ বিভিন্ন লাইন)।
প্রতিটি সিএনজি থেকে মাসে ৫০০ টাকা এবং লেগুনা থেকে ২,০০০ টাকা হারে চাঁদা নেওয়া হয়। চাঁদা তোলার জন্য আলাদা লোক নিয়োগ দেওয়া আছে, যাদের কাজ কেবল চালকদের সাথে যোগাযোগ করে টাকা আদায় করা।
অনুসন্ধানে পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, পটিয়ার ১৫টি সিএনজি স্টেশন লাইন থেকে প্রতি মাসে আনুমানিক প্রায় ১০ লাখ টাকার মতো চাঁদা সংগৃহীত হয়।
বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, সংগৃহীত এই বিপুল অঙ্কের টাকা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে ট্রাফিক অফিস, থানা ও চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের পকেটে যায়।
সম্প্রতি সংবাদকর্মীরা মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু করলে সিন্ডিকেট চক্রটি তাদের কৌশল বদলে ফেলে। প্রকাশ্যে টোকেন দেওয়া বন্ধ করে এখন চালকের নাম, মোবাইল নম্বর এবং গাড়ির নম্বর/ইঞ্জিন নম্বরের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।
এই ব্যবস্থাটি কীভাবে কাজ করে—তার অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য মেলে। মাসিক চাঁদা দেওয়া চালক ও গাড়ির একটি সারিবদ্ধ তালিকা সরাসরি থানা ও ট্রাফিক অফিসে পৌঁছে দেয় সিন্ডিকেটের সদস্যরা। তালিকায় থাকা গাড়ি ও চালকদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো ব্যবস্থা নেয় না। উপরন্তু, সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য বদিউল আলম বদি, এনাম ও লাইনম্যান সভাপতি করিমকে প্রায়শই থানা ও ট্রাফিক অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অবাধে উঠাবসা ও দেখা সাক্ষাৎ করতে দেখা যায়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই চাঁদাবাজ চক্রের সদস্যদের অধিকাংশেরই দৃশ্যমান কোনো বৈধ আয়ের উৎস বা নির্দিষ্ট ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান নেই। এই অবৈধ ‘টোকেন বাণিজ্য’ এবং চাঁদার টাকাই তাদের মূল উপার্জনের মাধ্যম।
বদিউল আলম বদি ও এনাম: এলাকায় কোনো দৃশ্যমান ব্যবসা বা চাকরি না থাকলেও শুধুমাত্র সড়ক চাঁদাবাজির ওপর ভর করেই তারা বিলাসী জীবনযাপন করছেন। বিশেষ করে এনাম এই সিন্ডিকেটে জড়িয়ে চাঁদাবাজির অবৈধ টাকায় ইতোমধ্যে নিজের একটি বাড়ি নির্মাণ করেছেন এবং দুটি সিএনজি অটোরিকশার মালিক হয়েছেন।
ফোরকান: পেশায় তিনি সাধারণ একজন সিএনজি অটোরিকশা চালক হলেও সিন্ডিকেটের হাত ধরে এখন লাইন নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।
সাদ্দাম: পটিয়ার পরিবহন খাতে চাঁদা আদায়ের পাশাপাশি স্থানীয় মাদক কারবারের সাথেও তার সরাসরি জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
করিম ও সোলাইমান: শান্তিরহাট সিএনজি লাইনের নিয়ন্ত্রণকারী এই দুইজনের নির্দিষ্ট কোনো ব্যবসা বা চাকরির নির্ভরযোগ্য তথ্য মেলেনি। লাইন নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদা তোলাই তাদের প্রধান পেশা।
স্থানীয়দের মতে, কোনো বৈধ পেশা না থাকা সত্ত্বেও সিন্ডিকেটের এই সদস্যরা রাতারাতি অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন, যার নেপথ্যে রয়েছে সাধারণ চালকদের পকেট কাটা সড়ক চাঁদাবাজির টাকা।
সড়ক চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত পটিয়া উপজেলা সিএনজি মালিক সমিতির সভাপতি বদিউল আলম বদি ও শান্তিরহাট সিএনজি মালিক সমিতির সভাপতি করিমের বক্তব্য জানতে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। সাংবাদিকরা মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও তারা সাড়া দেননি; এমনকি সরাসরি সাক্ষাতের চেষ্টা করেও তাদের সন্ধান মেলেনি। ফলে এ বিষয়ে তাদের কোনো মতামত নেওয়া সম্ভব হয়নি।
যানবাহন চালকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মামলার হাত থেকে বাঁচতে এবং সড়কে বাধা ছাড়া গাড়ি চালাতে বাধ্য হয়েই তারা এই টাকা দেন। চাঁদা দিলে সড়কে আর কোনো প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হতে হয় না। তবে চাঁদা না দিলেই শুরু হয় বেপরোয়া নিগ্রহ—গাড়ি নামাতে বাধা, মোটা অঙ্কের মামলা এবং পুলিশি অভিযানের ভয় দেখানো হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক লেগুনা চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
মাসিক চাঁদা না দিলে থানার 'ডিউটি'র কথা বলে গাড়ি আটকে রাখা হয়। ফ্রিতে ডিউটি করতে না চাইলে মামলা দিয়ে গাড়ি ডাম্পিংয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আর লাইসেন্সবিহীন গাড়ি আটকে চাবি কেড়ে নিয়ে চিরতরে ডাম্পিংয়ের ভয় দেখিয়ে অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে ছাড়ানো হয়। এই হয়রানি থেকে বাঁচতেই আমরা বাধ্য হয়ে চাঁদা দিয়ে গাড়ি চালাই।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ট্রাফিক পুলিশের দাবি, লাইসেন্সবিহীন যানবাহনের নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই এবং টাকা নেওয়ার বিষটি অস্বীকার করে। কার মাধ্যমে এই লেনদেন হয় সেটি সংবাদকর্মীদের বের করে তাদের সহায়তা করতে বলেন, এতে ট্রাফিক পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিবে বলে আশ্বাস দেয়।
পটিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জিয়াউল হক জানান, যানবাহনের এই সেক্টর ট্রাফিক অফিসে দেখাশুনা করে। আর থানায় চাঁদা নেওয়ার কথা ভিত্তিহীন এর কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই এবং এর সাথে থানার কোন সম্পর্ক নেই। থানার কোনো পুলিশ সদস্য যদি এই চাঁদার সিন্ডিকেট এর সাথে সংযুক্ত থাকে তাহলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সিন্ডিকেট চক্রের সদস্যরা থানায় কেনো আসা যাওয়া করে সে বিষয়ে তিনি অবগত নয়। তবে নির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে এই চাদাবাজ সিন্ডিকেট এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে তিনি জানান ।
এদিকে নিবন্ধিত ও দক্ষ চালক না থাকা এবং মহাসড়কে অনভিজ্ঞ চালকদের হাতে অবৈধ যান চলায় পটিয়ায় নিত্যদিন ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব লাইসেন্সবিহীন যান ও অনভিজ্ঞ চালকদের কারণে
এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং সড়ক দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
জনসাধারণ ও সচেতন মহল অবিলম্বে এই চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে মহাসড়ক থেকে সব ধরণের অবৈধ যান স্থায়ীভাবে উচ্ছেদের জোরালো দাবি জানিয়েছেন।
এ জাতীয় আরো খবর..
