মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে সরকার ঘোষিত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। অথচ লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীর বিভিন্ন এলাকায় থামছে না ইলিশ শিকার ও বেচাকেনা। রামগতি, কমলনগর, রায়পুর ও সদর উপজেলার কয়েকটি মাছঘাটে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মাছ কেনাবেচার অভিযোগ উঠেছে। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের একাধিক চক্র জড়িত বলেও দাবি করেছেন স্থানীয় জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ। তবে অভিযুক্তরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞার ১৪ দিন পেরিয়ে গেলেও অনেক জেলে সরকারি খাদ্যসহায়তার চাল পাননি বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে কর্মহীন জেলেদের পরিবারে বাড়ছে আর্থিক সংকট।
১৪ দিনে ১৫১অভিযান, ১১১ জেলে আটক
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার প্রথম ১৪ দিনে লক্ষ্মীপুরে ১৫১টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ১১১ জন জেলেকে আটক করা হয়। জব্দ করা হয়েছে ৩ দশমিক ০ মেট্রিক টন ইলিশ, ১৭দশমিক ৭৭লক্ষ মিটার মাছ ধরার জাল, ১৪টি নৌকা ও একটি স্পিডবোট। এ ছাড়া ১৪ টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১লক্ষ্য ৫৪ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অবৈধভাবে মাছ শিকার ও পরিবহনের অভিযোগে করা ৪৫ টি মামলায় ৬৮ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীসহ দেশের নির্ধারিত নদ-নদী, মোহনা ও সাগরে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ সময় মাছ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বিক্রিও নিষিদ্ধ। নিষেধাজ্ঞার সময় নিবন্ধিত জেলেদের পরিবারকে খাদ্যসহায়তা হিসেবে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা রয়েছে।
ঘাটে ঘাটে ইলিশ বেচাকেনার অভিযোগ
গত (১৬ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর) পর্যন্ত লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চর রমণী মোহন ইউনিয়নের মজুচৌধুরীরহাট-সংলগ্ন ভাসমান জেলেপল্লী ও দক্ষিণের নদীতীরবর্তী কয়েকটি এলাকা ঘুরে ইলিশ বেচাকেনার দৃশ্য দেখা যায়। নৌকা থেকে মাছ নামানোর পর ব্যবসায়ীদের দরদাম করে ইলিশ কিনতে দেখা যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোস্টগার্ডের ট্রলার দেখা গেলে জেলে ও ব্যবসায়ীরা সাময়িকভাবে মাছ বেচাকেনা বন্ধ রাখেন। ট্রলার চলে যাওয়ার পর আবারও শুরু হয় কেনাবেচা।
এলাকার কয়েকজন জেলে জানান, নিষেধাজ্ঞার কারণে তাঁদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারি সহায়তার ২৫ কেজি চাল দিয়ে পুরো ২২ দিন পরিবারের খরচ চালানো কঠিন। তাঁদের অভিযোগ, বড় নৌকায় মাছ শিকার করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, অথচ ছোট নৌকায় মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরলেই অভিযান চালানো হয়।
এক তরুণ জেলের ভাষ্য, মেঘনার সাহেবের চর ও চর মেঘা এলাকায় বড় ট্রলারে মাছ ধরার অভিযোগ থাকলেও সেসব কর্মকাণ্ড বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। তাঁর দাবি, জেলেদের জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে তাঁরা নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে পারবেন।
রামগতিতে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
রামগতি বাজার মাছঘাট-সংলগ্ন ভাসমান জেলেপল্লী বা মান্তাপাড়া এলাকায় সকাল, বিকেল ও রাতেও ইলিশ কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় জেলে ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বিকেলে মাছ ধরতে যাওয়া ৮ থেকে ১০টি নৌকা সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে ঘাটে ফেরে। এ ছাড়া রাতে মাছ শিকারে যাওয়া আরও ১২ থেকে ১৫টি নৌকা ভোরে ঘাটে আসে। এসব নৌকার মাছ কিনতে বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা যানবাহন নিয়ে সেখানে ভিড় করেন।
এলাকার তিনজন মাছ ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম, বিএনপির কর্মী ডলার নোমান ও হালিম মাঝির নিয়ন্ত্রণে এসব নৌকা পরিচালিত হচ্ছে। তাঁদের দাবি, নদীতে মাছ ধরার কার্যক্রম চালাতে জেলেদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয় এবং বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয় করা হয়।
সিরাজ ব্যাপারী ও ইসমাইল মাঝি জানান, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তাঁরা ওই এলাকা থেকে মাছ কিনছেন। তাঁদের দাবি, সেখানে প্রায় দুই শতাধিক ব্যবসায়ী মাছ কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় ব্যবসায়ী ফজল করিম ও আবির হোসেনের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় এবার নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে প্রশাসনের তৎপরতা কম।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কমলনগরেও নিষেধাজ্ঞা অমান্যের অভিযোগ
কমলনগরের মতিরহাট মাছঘাট এলাকায় চরকালকিনি ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি হুমায়ুন কবির ও ফারুক হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ থেকে সাতটি নৌকায় মা ইলিশ শিকারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় এক মাছ ব্যবসায়ীর দাবি, নিষেধাজ্ঞার মধ্যে একটি চক্র প্রায় ৩০টি মাছ ধরার ট্রলার নদীতে নামিয়েছে। এসব ট্রলারে ধরা ইলিশ লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার সাহেবের চরসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কিছু সদস্যের যোগসাজশ থাকার অভিযোগও করেছেন ওই ব্যবসায়ী।
অন্যদিকে, রোববার সন্ধ্যায় মতিরহাট মাছঘাটের পূর্ব পাশে প্রায় ২৫টি ভাসমান জেলেপল্লীতে মাছ ধরার প্রস্তুতি নিতে দেখা যায় কয়েকজনকে। ফরহাদ নামের এক জেলেকে মাছ ধরার দুই বস্তা জাল নৌকায় তুলতে দেখা যায়। পাশে পল্লীর সরদার বাবুল মাঝিসহ আরও কয়েকজন ছিলেন।
ফরহাদ জানান, তাঁর পরিবারে নয়জন সদস্য। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় আয়-রোজগার নেই। তাঁর অভিযোগ, সরকারি সহায়তাও পাচ্ছেন না। মাছ ধরতে না পারলে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার হাজিমারা, আলতাফ মাস্টারঘাট, সাজু মোল্লারঘাট ও রাউলঘাটের আশপাশেও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ইলিশ বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এদিকে, অভিযোগ ওঠা ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
৪২ হাজার জেলের জন্য বরাদ্দ ১ হাজার টনের বেশি চাল
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, লক্ষ্মীপুরে সরকারি নিবন্ধিত কার্ডধারী জেলের সংখ্যা ৪২ হাজার ১৫০। মা ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় তাঁদের জন্য ভিজিএফ খাদ্যসহায়তা হিসেবে ১ হাজার ৫৩ দশমিক ৭৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক নিবন্ধিত জেলে ২৫ কেজি করে চাল পাওয়ার কথা। তবে বেসরকারি হিসাবে জেলায় জেলের সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজার।
কমলনগরের চরকালকিনি ইউনিয়নের মনির মাঝি, শরীফ মাঝি ও জাহাঙ্গীর মাঝি জানান, তাঁরা সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে নৌকা ডাঙায় তুলে রেখেছেন। কিন্তু সময়মতো চাল না পাওয়ায় পরিবার নিয়ে সংকটে পড়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, প্রকৃত জেলেদের কাছে সহায়তা যথাসময়ে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা জেলেদের একাংশও জীবিকার তাগিদে মাছ ধরতে নামার ঝুঁকি নিচ্ছেন।
চরকালকিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ছায়েফ উল্যাহ বলেন, তাঁদের ইউনিয়নে প্রায় ৩ হাজার ১০০ জেলে রয়েছেন। নিবন্ধন কার্ড সংগ্রহে সময় লাগায় চাল বিতরণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। রোববার থেকে প্রত্যেক জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল বিতরণ শুরু করার কথা জানান তিনি।
নিয়মিত অভিযানের কথা মৎস্য বিভাগের
রামগতি উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. সৌরভ-উজ-জামান বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে তিনিও অভিযোগ শুনেছেন। গত দুই দিনে সংশ্লিষ্ট এলাকায় কয়েকবার গেছেন এবং অভিযুক্ত জাহাঙ্গীরকে ফোনে সতর্ক করেছেন। এ ছাড়া কিছু জাল ও নৌকা আটক করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নিয়মিত অভিযান চলছে বলেও জানান তিনি।
লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, মা ইলিশ সংরক্ষণে নিষেধাজ্ঞা শুরুর পর থেকেই মৎস্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন, কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। প্রথম ১৪ দিনে ১৫১ টি অভিযানে ১১১ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। ৬৮ জনকে কারাদণ্ড এবং ১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য শুধু সাজা দেওয়া বা জরিমানা আদায় করা নয়; জেলেদের সরকারি নির্দেশনা সম্পর্কে সচেতন করাও গুরুত্বপূর্ণ। এরপরও বিভিন্ন স্থানে মাছ শিকারের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে নদীতে টহল ও নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অবৈধ মাছ শিকার, পরিবহন ও কেনাবেচার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত জেলেদের জন্য বরাদ্দ করা খাদ্যসহায়তা দ্রুত বিতরণ এবং সহায়তার তালিকায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় মা ইলিশ রক্ষার উদ্যোগ প্রত্যাশিত সুফল থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
