ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে শুধু বর্ষা মৌসুমে এডিস মশা নিধনে তৎপরতা নয়, বরং বছরজুড়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও নতুন উৎস তৈরি হতে না দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ এডিস মশা পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন হলেও এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) গবেষণা অনুযায়ী, এডিস এজিপ্টি মশার ডিম শুষ্ক পরিবেশেও অন্তত আট মাস সক্রিয় থাকতে পারে। ফলে শীতকালে মশার উপদ্রব কমে গেলেও ডেঙ্গুর ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয় না। সামান্য পানি পেলেই এসব ডিম থেকে লার্ভা জন্ম নিয়ে আবার মশার বংশবিস্তার ঘটাতে পারে। এ অবস্থায় সুপ্ত ডিম ও লার্ভা ধ্বংস, বাসাবাড়ি ও আশপাশের জমে থাকা পানি অপসারণ এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সারা বছর অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন কীটতত্ত্ববিদরা। তাদের মতে, নতুন প্রজননস্থল তৈরি হতে না দেওয়া এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে পারলে ডেঙ্গুর বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এদিকে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ৩২১ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে শুধু অক্টোবরের প্রথম ১৩ দিনেই প্রাণ হারিয়েছেন ৭৬ জন। তবে বৃষ্টিপাত কম থাকায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে আশা করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সংস্থাটির রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার কর্মকর্তাদের ধারণা, নভেম্বরের মাঝামাঝি সংক্রমণের গ্রাফ নিম্নমুখী হতে পারে এবং ডিসেম্বরে
পরিস্থিতিতে আরও কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্টদের একাধিকবার নির্দেশনা দিয়েছেন ডেঙ্গু মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে। বিশেষ করে পরিচ্ছন্নতার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এজন্য সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও ব্যক্তি এগিয়ে এসেছেন। তবে এই উদ্যোগ ধরে রাখা নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। কারণ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও ব্যক্তি পর্যায়ে যারা কাজ করছেন, তাদের উৎসাহ না দিলে তারা হারিয়ে যেতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি এডিস এজিপ্টি মশা একেবারে একশ’র মতো ডিম দেয়। আর ডিম ছাড়ার জন্য এই মশা বেছে নেয় স্বল্প গভীরতার পানি; যেমন— বোতল, কাপ, টব, টায়ারের মতো স্থান। এদের ডিমের খোলস হয় বেশ শক্ত; তা শুষ্ক পরিবেশেও অন্তত আট মাস সক্রিয় থাকে। যখন পানি ডিমটি পুরো ঢেকে দেয়, তখন ডিম থেকে লার্ভা হয়। লার্ভা থেকে পিউপা হয়ে পরিপূর্ণ মশায় রূপ নিতে সময় লাগে আট-থেকে ১০ দিন।
গবেষকদের মতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা যে শহরে বা যে এলাকায় একবার বিস্তার করে, সে এলাকায় কখনই পুরোপুরি নির্মূল হয় না। কারণ এডিস মশার ডিম শুকনা পরিবেশেও নয় মাস পর্যন্ত সক্রিয় থাকে, নষ্ট হয় না। আর যখনই স্বচ্ছ পানির সংস্পর্শে আসে, তখন তা লার্ভা হয়; রূপ নেয় পরিপূর্ণ মশায়।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বৈঠকে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণবিষয়ক সভায় প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দেন। সেখানে উল্লেখ করেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আগামী কয়েক মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় মানুষ বেশি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন, সেসব এলাকায় প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিয়মিত বিশেষ কর্মসূচি পালন করছে। ঢাকার প্রতি সরকার ও সাধারণ নাগরিকদের দৃষ্টি বেশি থাকলেও প্রচারণা ও পরিচ্ছন্নতায় ঘাটতি রয়েছে জেলা শহরগুলোয়। তাই বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার ঢাকায় আক্রান্ত কম হলেও চিকিৎসার প্রয়োজনে ডেঙ্গু রোগীদের ঢাকামুখী হওয়ার কারণে ঢাকায় বরাবরই সংখ্যাগত দিক দিয়ে এগিয়ে রয়েছে। তবে এবার ঢাকার বাইরের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক।
বিশ্লেষকদের মতে, এডিস মশা যেহেতু পুরোপুরি নির্মূল হয় না। তাই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলেও পরিচ্ছন্নতা এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধ কর্মসূচি বন্ধ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকলেই ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই শুধু মৌসুমভিত্তিক নয়, বছরব্যাপী কর্মসূচি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার আমাদের সময়কে বলেন, ডেঙ্গু এখন আর শুধু বর্ষাকালের জন্য নয়। এটি সারাবছরই থাকে; কিন্তু শীত এলে একটু কমে যায়। কারণ শীতের সময় যে কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার গ্রোথ রেট কমে যায়। তাছাড়া শীতের সময় বৃষ্টিপাত কম থাকে; যে কারণে লার্ভাগুলো সুপ্ত অবস্থায় থেকে যায়; কিন্তু এই ভালো থাকাকে কেন্দ্র করে সিটি করপোরেশন বা অন্যান্য সংস্থাগুলো যদি তাদের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলে, তাহলেই মহাবিপদ। কারণ সুপ্ত লার্ভাগুলো একটু বৃষ্টির পানি পেলেই জীবন ফিরে পায়। তাই সরকারের উচিত, বছরব্যাপী কর্মপরিকল্পনা ঠিক করা এবং লার্ভা যেসব জায়গায় জন্মায় বা সুপ্ত থাকে, সেগুলো পরিচ্ছন্ন রাখা এবং নতুন কোনো সোর্স তৈরি হতে না দেওয়া, তাহলেই কেবল স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত বুলেটিন অনুযায়ী দেশে গত এক দিনে (বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯২০ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট ৩২১ জনের প্রাণ গেল। এর মধ্যে অক্টোবরের ১৩ দিনে মারা গেছেন ৭৬ জন; আর হাসপাতালে মোট ভর্তি রোগী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৩১৬ জনে। অন্য বিভাগের মধ্যে বরিশালে ২১৫ জন, চট্টগ্রামে ২৫৬, খুলনায় ২৫৪, ময়মনসিংহে ১১৪, রাজশাহী ১৭০, রংপুরে ৭০ এবং সিলেটে ১৭ জন ভর্তি হয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার লাইন ডিরেক্টর প্রফেসর ডা. মো. হালিমুর রশিদ আমাদের সময়কে বলেন, এখন বৃষ্টি নেই, তাই ডেঙ্গু পরিস্থিতি কিছুটা ভালো। আবার বৃষ্টি হলেই বিস্তার বাড়তে পারে। নভেম্বরের মাঝামাঝি গ্রাফ নামতে পারে। ডিসেম্বরে মোটামুটি ভালো উন্নতি ঘটতে পারে। এটি পুরোপুরি বৃষ্টির ওপর নির্ভর করছে।
বিশ্লেষক ও ডেঙ্গু পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত সাধারণ নাগরিকরা মনে করেন, সরকারের চলমান উদ্যোগকে অব্যাহত রেখে কীভাবে আরও বেশি মানুষের অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সেদিকে নজর দিতে হবে। শুধু বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে কর্মসূচি না নিয়ে বছরব্যাপী বিশেষ নজর দিলে ধীরে ধীরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ উন্নত দেশগুলো এভাবেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সফলতা দেখিয়েছে।
