দুর্গাপুজোর ঢাক বাজলেই বন্ধ হয়ে যেত ঘরের দরজা। বাড়ির চারপাশ ঢাকা পড়ত কালো কাপড়ে। উৎসবের আলো থেকে দূরে, ঘরের অন্ধকারে চলত পূর্বপুরুষের স্মরণ। কিন্তু সেই ছবিটাই এখন অতীত হওয়ার পথে! যে দুর্গাপুজোয় একসময় শোক পালন করতেন পূর্বপুরুষেরা, সেই পুজোতেই নতুন পোশাক পরে বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরছে উত্তরসূরিরা। উত্তরবঙ্গের অসুর জনজাতির অন্দরে নিঃশব্দে ঘটে চলেছে এই বদল। বদলে গিয়েছে অসুর-সমাজ, দুর্গাপুজোয় মণ্ডপে এবার মহিষাসুরের নয়া প্রজন্ম!
নাগরাকাটার পাহাড়ঘেরা ক্যারন চা বাগানে প্রায় দেড়শো অসুর পরিবারের বসবাস। কারি লাইন, খাপরা লাইন ও মতু লাইনে তাঁদের বসতি। মূলত চা শ্রমিক এই জনজাতির বিশ্বাস, দেবী দুর্গার হাতে নিহত মহিষাসুর তাঁদের পূর্বপুরুষ। তাই দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে ঘরবন্দি থেকে শোক পালনের রীতি ছিল তাঁদের মধ্যে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে সেই প্রথা। বাগানের বাসিন্দা সরিতা অসুর ও মিনা অসুর বলেন, “আগে পুজোয় বাড়ি থেকে বের হতাম না। এখন মণ্ডপে যাই।” সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে তাঁদের মানসিকতাও। নতুন প্রজন্ম এখন আর সেই ভাবনায় বসে নেই। পুরনো ভাবনাকে ভেঙে তাঁরা ইদানীং ঘর থেকে পূজ্যর দিনগুলিতে বাড়ির বাইরে বেরচ্ছেনও।
কেবল ঘরের বাইরে পা রাখাই নয়, পুজো মণ্ডপেও যায় অসুর পরিবারের ছেলেমেয়েরা। অন্যান্যদের সঙ্গে পুজোয় সামিল হচ্ছে ওই সম্প্রদায়ের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা। ছাত্র সোনাম অসুরের কথায়, “বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাই। আনন্দ করি।” স্থানীয় বাসিন্দা ধানবীর সিং জানান, শুধু কারি লাইনেই প্রায় ৫০টি অসুর পরিবার রয়েছে। আগে প্রবীণরা দুর্গাপুজোয় যেতেন না। এখন ছেলেমেয়েরা স্কুলে পড়ছে। শিক্ষার প্রসার, বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশায় বদলাচ্ছে মানসিকতা।
ক্যারনের পাশাপাশি মেটেলি-সহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় অসুর জনজাতির বসবাস। নিজস্ব বিশ্বাস অটুট রেখেই উৎসবের আনন্দে সামিল হচ্ছেন অনেকে। একসময় যে পুজোয় বন্ধ থাকত ঘরের দরজা, আজ সেই পুজোর মণ্ডপেই ভিড় জমাচ্ছে নতুন প্রজন্ম। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার এই মেলবন্ধনেই বদলে যাচ্ছে অসুর সমাজের উৎসবের ছবি। দেবীপক্ষ শুরু হয়ে গিয়েছে। আশপাশের মণ্ডপগুলিতে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। এবারও দেবী দুর্গার পুজোয় মেতে উঠতে মুখিয়ে আছে নতুন প্রজন্ম।
