Published on
:
2 min read
এই সময়, বর্ধমান: গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় ঠাকুর দেখতে যাওয়ার ইচ্ছে একেবারেই ছিল না। তবুও ১৫ অক্টোবর মা ও দিদির হাত ধরে মামা ও মামির সঙ্গে কলকাতায় গিয়েছিল পূর্ব বর্ধমানের মাধবডিহির বীরপুর গ্রামের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ১৪ বছরের সন্দীপ বেজ। দিদি আগমনিকে সে আগেই বলেছিল, ‘ওখানে খেলার কোনও সঙ্গী পাব না।’ কিন্তু মায়ের হাত ছেড়ে থাকতে পারবে না বলেই সে রাজি হয়েছিল। রবিবার দ্বিতীয় সপ্তমীর দিন গ্রামে ফিরে গ্রামের দুর্গাপুজোয় মেতে ওঠার ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু তার বদলে সে দিন বীরপুর গ্রামে ফিরল সন্দীপ, তার মা টগর বেজের (৩৭) নিথর দেহ। কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন পুজোমণ্ডপে শনিবার প্রথম সপ্তমীর সন্ধ্যায় মর্মান্তিক পদপিষ্টের ঘটনায় প্রাণ হারান তাঁরা। মারা গিয়েছেন হুগলির বালিয়া গ্রামের বাসিন্দা সন্দীপের মামি পিয়ালী পরামাণিকও (২৫)।
গত বৃহস্পতিবার ১৫ অক্টোবর দুই সন্তান সন্দীপ ও আগমনিকে নিয়ে বীরপুর থেকে হুগলির বালিয়ায় বাপের বাড়ি গিয়েছিলেন টগর। সেখান থেকে শুক্রবার তাঁরা কলকাতায় পৌঁছন এবং শনিবার ন’জন মিলে চোরবাগানের পুজো দেখতে যান। সেই ভয়াবহ ঘটনার কথা বলতে গিয়ে আগমনি জানান, প্রতিমা দেখে বেরিয়ে তাঁরা যখন প্রচুর মানুষের চাপের মুখোমুখি হন, তখন তিনি সামনে ছিলেন এবং মা টগর তাঁর পিছনে ভাই সন্দীপের হাত ধরে ছিলেন। একসময়ে মা তাঁর কাঁধে মাথা এলিয়ে দিলে তাঁর মনে হয় তিনি জ্ঞান হারিয়েছেন, এর পরে তিনি নিজেও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এবং ভাইকে আর দেখতে পাননি। পরে হাসপাতালে গিয়ে মা, ভাই ও মামির মৃত্যুর খবর জানতে পারেন আগমনি। বাবা সঞ্জয় বেজের আক্ষেপ, ‘গোটা পাড়া মাতিয়ে রাখত আমার ছেলে। এখন মেয়েটাই ভরসা।’
এই মর্মান্তিক খবর বীরপুর গ্রামে পৌঁছতেই নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। পাঁচ পাড়া নিয়ে গঠিত পঞ্চগ্রাম দুর্গাপুজো কমিটির উদ্যোগে চলা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মাইক বাজানো তৎক্ষণাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়। নিয়ম রক্ষা করে শুধু পুজোটুকু হলেও সব আনন্দ অনুষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় কমিটি।
গত মঙ্গলবার বীরপুর গ্রামে এসে টগরের স্বামী সঞ্জয় বেজের হাতে মোট ৫০ লক্ষ টাকার দু’টি চেক তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একইসঙ্গে পরিবারের একজনকে চাকরি দেওয়ার ঘোষণা করে জেলাশাসককে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘যাঁরা গিয়েছেন, তাঁদের তো ফিরিয়ে দিতে পারব না। কিন্তু তার পরের দায়িত্বটা তো পালন করতে হবে। এটা কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।’ মুখ্যমন্ত্রীর এই মানবিক পদক্ষেপে সান্ত্বনা পেয়ে মৃতের ভাসুর উদয় বেজ বলেন, ‘যে ভাবে বাড়ির মাটির দাওয়ায় বসে মুখ্যমন্ত্রী আমাদের সঙ্গে কথা বললেন সেটা ভেবেও ভালো লাগছে। এই অসহায় পরিবারটি এখন আর কারও করুণায় বেঁচে থাকবে না, মুখ্যমন্ত্রী সেই ব্যবস্থা করে গেলেন।’
স্থানীয় বিধায়ক ও প্রশাসনকে এই পরিবারের প্রতি বিশেষ নজর রাখার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। রায়নার বিধায়ক সুভাষ পাত্রর কথায়, ‘পরিবারটির যে ক্ষতি হয়েছে তা অপূরণীয়, তবুও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পাশে থাকার সব দায়িত্ব পালন করব আমরা। মৃতের স্বামীকে বলেছি যে কোনও সমস্যায় যেন সরাসরি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।’ সূত্রের খবর, মাধবডিহি থানার পক্ষ থেকে ভিলেজ পুলিশের মাধ্যমে পরিবারটির সুরক্ষায় বিশেষ নজরদারি শুরু হয়েছে।
