তরুণদের মধ্যে নিজেকে সবসময় নিখুঁত হিসেবে তুলে ধরার তাড়না বা 'পারফেকশনিজম' আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। তবে কোনো কিছু অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষার চেয়েও ভুল করা বা অন্যের কাছে ছোট হওয়ার ভয় তরুণদের বেশি গ্রাস করছে।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (এপিএ) পিয়ার-রিভিউড জার্নাল সাইকোলজিক্যাল বুলেটিনে প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক গবেষণায় এ তথ্য ওঠে এসেছে।
১ লাখ ৯০ হাজারেরও বেশি গবেষক, শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞদের প্রতিনিধিত্বকারী বৈজ্ঞানিক সংস্থা এপিএ-তে প্রকাশিত এই গবেষণাকে গবেষকরা একটি 'পারফেকশনিজম মহামারি' হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের মনস্তত্ত্বের অধ্যাপক এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক থমাস কারান জানান, পারফেকশনিজম এখন একটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। যা তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্রমাবনতির পেছনে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
তিনি এই প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি এবং ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দায়ী করেছেন। তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যসংকট কাটাতে এসব সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উপাদানের দিকে নজর দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
১৯৮৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৮২ হাজারেরও বেশি আমেরিকান, কানাডিয়ান এবং ব্রিটিশ কলেজশিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত ৩০৭টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, শিক্ষার্থীদের নিখুঁত হওয়ার প্রবণতা ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী।
গবেষকরা ব্যাখ্যা করেছেন, পারফেকশনিজম বলতে কেবল কোনো কাজে ভালো করার ইচ্ছা বোঝায় না। এটি একটি বহুমুখী মানসিক অবস্থা যার মধ্যে রয়েছে নিজের জন্য অতিরিক্ত উচ্চমান নির্ধারণ করা, কঠোর আত্মসমালোচনা করা, অন্যেরা তার কাছে অতিরিক্ত প্রত্যাশা করছে বলে মনে করা এবং সামান্য ভুলে মাত্রাতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়া।
২০০০-এর দশকের শুরু থেকে সব ধরনের পারফেকশনিজম একই হারে বাড়েনি। গবেষণায় দেখা গেছে, নিজের উচ্চ লক্ষ্যপূরণের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে ব্যর্থতার ভয়, সিদ্ধান্তহীনতা এবং অপরের নেতিবাচক মূল্যায়নের তীব্র আশঙ্কার মতো মানসিক উদ্বেগগুলো অনেক দ্রুত গতিতে বেড়েছে।
গবেষণায় অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এই মানসিক পরিবর্তনের এক স্পষ্ট যোগসূত্র তুলে ধরা হয়েছে।
দেখা গেছে, যখন মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ধীরগতিতে বাড়ে, তখন তরুণদের মধ্যে কঠোর চেষ্টার মাত্রা বাড়ে। আবার যখন সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ে, তখন ভুল করা এবং অন্যদের নেতিবাচক মতামতের ভয় তরুণদের মানসিকভাবে গ্রাস করতে শুরু করে।
অধ্যাপক কারান তার জনপ্রিয় বই দ্য পারফেকশন ট্র্যাপ এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে বলেন, অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব দেখা দিলে তরুণরা নিজেদের কঠোর পরিশ্রম দিয়ে তা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। আর বৈষম্য বাড়লে অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গি ও ভুলের আশঙ্কাই তরুণ মানসিকতার প্রধান উদ্বেগ হয়ে ওঠে।
গবেষকদের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পারফেকশনিজমের ধরন বদলালেও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব একই রয়ে গেছে। যাদের মধ্যে নিখুঁত হওয়ার তাড়না বেশি, তাদের মধ্যে বিষণ্নতা (ডিপ্রেশন) ও দুশ্চিন্তার (অ্যাংজাইটি) লক্ষণ অনেক বেশি দেখা যায়। পারফেকশনিজমের এই বৃদ্ধি ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সামাজিক ও মানসিক স্বাস্থ্যসংকট তৈরি করতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
তামান্না রুপা/
