শৈশব একটি শিশুর পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার সময়। এ বয়সে বই-খাতা হাতে নিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, স্বপ্ন দেখার কথা ভবিষ্যৎ নিয়ে। কিন্তু ভোলার উপকূলীয় চরাঞ্চলের অনেক শিশুর জীবনে শৈশবের সেই স্বাভাবিক চিত্র নেই।
দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে তাদের হাতে উঠেছে মাছ ধরার জাল, বৈঠা আর নৌকার হাল। উত্তাল মেঘনা নদীতে জীবিকার সন্ধানে ছুটতে গিয়ে অনেক শিশুর শিক্ষাজীবন থমকে যাচ্ছে। কেউ ঝরে পড়ছে বিদ্যালয় থেকে, আবার কেউ শৈশবেই জড়িয়ে পড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে।
সরকারের পক্ষ থেকে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে বই ও উপবৃত্তির ব্যবস্থা থাকলেও দারিদ্র্যের কারণে অনেক পরিবারে তা প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণে যথেষ্ট হচ্ছে না। ফলে পরিবারের আর্থিক সংকট মেটাতে শিশুদেরও কাজে নামতে হচ্ছে। অন্যদিকে উপকূলের অনেক কন্যাশিশু বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে অল্প বয়সে সংসারের ভার বহন করছে।
ভোরের সূর্য মাত্র উঁকি দিচ্ছে। পূর্ব আকাশের আলোয় মেঘনার মিঠাপানি যেন রঙ ছড়াচ্ছে। নদীপাড়ের চায়ের দোকানে কাপ-পিরিচের টুংটাং শব্দ, মাছের আড়তে শাটার খোলার ব্যস্ততা, ভ্যান থেকে বরফ নামানো আর জেলেদের হাঁকডাকে মুখর হয়ে উঠেছে উপকূলীয় চরাঞ্চল। এরই মধ্যে কাঁচিয়ার মাছঘাটে ইলিশ, পোয়া, পাঙ্গাস, বেলে, তপসে ও আইড়সহ নানা প্রজাতির মাছ নিয়ে দরদাম করছে ১২ বছর বয়সী শিশু হোসেন।
যে বয়সে তার বিদ্যালয়ে থাকার কথা, সেই বয়সেই পরিবারের জীবিকা নির্বাহে মাছ বিক্রি ও নদীতে মাছ ধরার কাজে যুক্ত সে। হোসেনের মতো আরও অনেক শিশু বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল নদীর ঝুঁকি উপেক্ষা করে জীবিকার সন্ধানে নেমে পড়ে। এসব পরিবারের কাছে মাছ ধরা কেবল পেশা নয়, বরং খাবার জোগাড় করে বেঁচে থাকার লড়াই।
হোসেন জানায়, প্রতিদিন বাবার সঙ্গে নৌকা ও জাল নিয়ে নদীতে যায় সে। তারা চার ভাইবোন। অভাব-অনটনের সংসারে দুবেলা খাবার জোগাড় করাই কঠিন। তাই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া তার পরিবারের পক্ষে সম্ভব হয়নি। গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর থেমে গেছে তার শিক্ষাজীবন।
পরিবারের খাবার জোগাড় করতে হোসেনের মতো অনেক শিশুকেই কোমল হাতে নৌকার বৈঠা ধরতে হয়, রাতের আঁধারে নদীতে জাল ফেলতে হয়। জীবিকার তাগিদে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের শৈশব, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ।
কন্যাশিশুদের শৈশবেও বাল্যবিবাহের চাপ
ভোলার উপকূলীয় চরাঞ্চলে শুধু ছেলেশিশুরাই নয়, কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে কন্যাশিশুরাও। দারিদ্র্য, অসচেতনতা ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে অনেক মেয়েকে অল্প বয়সেই বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সংসারের দায়িত্বও কাঁধে নিতে হচ্ছে তাদের।
জেলার সাগরকূলের জনপদ ঢাল চরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ১৪ বছর বয়সী সুমাইয়া, ১৩ বছর বয়সী সাথী ও ১৫ বছর বয়সী কুলছুমের মতো কিশোরীদের জীবনেও নেই স্বাভাবিক শৈশবের সুযোগ। তাদের কেউই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে পারেনি।
সুমাইয়া জানায়, অভাবের কারণে মাত্র ১৩ বছর বয়সে তার বিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে ১৪ বছর বয়সেই সে এক শিশুসন্তানের মা। অপুষ্টিতে ভুগে তার শারীরিক অবস্থাও অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে।
দারিদ্র্য ও অসচেতনতায় বাড়ছে শিশুশ্রম
মাছ ব্যবসায়ী, জেলে ও মৎস্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অভাবের সংসার এবং অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে অনেক শিশু বিদ্যালয়ে না গিয়ে নদীতে মাছ ধরতে যাচ্ছে। অন্যদিকে নৌকাবাসী মান্তা সম্প্রদায়ের জেলেরা সন্তানদের নিয়ে দিনের বেশির ভাগ সময় নদীতে মাছ ধরেন। মাছ ধরা শেষে রাতে মেঘনা নদীসংলগ্ন কোনো খালে নৌকা নিয়ে আশ্রয় নেন তারা।
সদর উপজেলার ইলিশা ইউনিয়ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রফিক রাইজিং বিডি কে বলেন, তার বিদ্যালয়ের চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া নয়জন শিশু প্রতিদিন বাবার সঙ্গে নদীতে মাছ ধরতে যায়। তারা দুই থেকে তিন মাস পর বিদ্যালয়ে এসে কিছুদিন ক্লাস করে পরীক্ষায় অংশ নেয়। এসব শিশুকে নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
জেলায় ৪৬ হাজারের বেশি কর্মজীবী শিশু
ভোলার পরিসংখ্যান কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট জনসংখ্যা ১৯ লাখ ৩২ হাজার ৪৪৪ জন। এর মধ্যে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ৫ লাখ ২৬ হাজার ৩৬৪। জেলায় কর্মজীবী শিশুর সংখ্যা ৪৬ হাজার ৮৪৬। এর মধ্যে ২৩ হাজার ১৬০ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিয়োজিত। তবে শিশু জেলেদের আলাদা কোনো পরিসংখ্যান নেই এ দপ্তরে।
জেলা মৎস্য কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ভোলায় ছোট ও মাঝারি নৌকা রয়েছে প্রায় ১৮ হাজার এবং সাগরগামী ফিশিংবোট রয়েছে সাত হাজার। জেলে, মৎস্য আড়তদার ও মৎস্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিটি নৌকায় গড়ে দুজন করে শিশু মাছ ধরার কাজে যুক্ত থাকলে জেলায় শিশু জেলের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩৬ হাজার।
শিশুদের মাছ ধরার পেশায় যুক্ত হওয়াকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। উত্তাল নদীতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় রোদে থাকা, অপুষ্টি ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব তাদের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
শৈশব ফিরিয়ে দেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
ভোলার উপকূলীয় অঞ্চলের শিশুদের জীবনচিত্র বলছে, শুধু বিনা মূল্যে বই বিতরণ কিংবা উপবৃত্তি প্রদান করলেই শিশুশ্রম বন্ধ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দরিদ্র পরিবারগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশুদের চিহ্নিত করা, নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় শিশুদের নিয়োগ বন্ধে কার্যকর নজরদারি।
নদী ও জীবিকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা এসব পরিবারের শিশুদের জন্য প্রয়োজন বিশেষ সহায়তা ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ। যাতে হোসেনের হাতে মাছ ধরার জালের পরিবর্তে আবারও বই-খাতা উঠে আসে, আর রাবেয়াদের মতো কিশোরীদের শৈশব বাল্যবিবাহ ও অকাল মাতৃত্বের চাপে হারিয়ে না যায়।
