বাঙালি হিন্দুর প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। কিন্তু এটি নিছক ধর্মীয় আচার নয়, বাঙালির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আবেগময় জীবনেরও এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। শরৎ এলেই প্রকৃতির রূপ বদলে যায়, আগমনী সুরে মুখরিত হয় বাংলার আকাশ-বাতাস। আনন্দময়ী দুর্গার আগমনে মানুষের মনে জেগে ওঠে নতুন আশার আলো। দৈনন্দিন জীবনের অভাব, হতাশা, ব্যর্থতা ও বিপর্যয় ভুলে মানুষ কয়েকটি দিনের জন্য ডুব দেয় আনন্দের স্রোতে। নতুন পোশাক, আলোকসজ্জা, মণ্ডপ, ঢাকের বাদ্য আর প্রিয়জনের সঙ্গে মিলনমেলায় উৎসব হয়ে ওঠে জীবনের নতুন করে শুরু করার প্রেরণা।
দুর্গাপূজার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এখানেই। ধর্মীয় বিশ্বাসের গণ্ডি ছাড়িয়ে এই উৎসব মানুষের মিলন, সম্প্রীতি ও আনন্দের উপলক্ষ হয়ে ওঠে। ধনী-দরিদ্র, পরিচিত-অপরিচিত, নানা পেশা ও শ্রেণির মানুষ একই উৎসবের আবহে শামিল হন। এই আনন্দযজ্ঞে প্রত্যেকেরই অধিকার আছে। তাই পূজার আনন্দ যেন কারও দুঃখের কারণ না হয়, কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না করে, কারও নিরাপত্তা ও স্বস্তি বিঘ্নিত না করে, সেই দায়িত্বও সবার। উৎসবের সার্থকতা কেবল আনন্দে নয়, অন্যের আনন্দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার মধ্যেও।
শারদীয় দুর্গাপূজাকে বলা হয় অকালবোধন। প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, রাবণবধের আগে রাম শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। সেই সময় দেবতাদের নিদ্রাকাল বলে বিবেচিত হওয়ায় বিশেষ স্তব ও আচারের মাধ্যমে দেবীকে জাগিয়ে পূজা করা হয়। সেই থেকেই শরৎকালের দুর্গাপূজার সঙ্গে অকালবোধনের কাহিনি যুক্ত হয়েছে। বাঙালির ধর্মীয় কল্পনা ও সাহিত্য এই আখ্যানকে আপন করে নিয়েছে। কৃত্তিবাসী রামায়ণে অকালবোধনের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা বাংলার নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছে। তবে আমরা দুর্গাপূজা বললেও এই পূজা কেবল দুর্গার একার নয়। দেবী আসেন তার পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে। প্রতিমার চালচিত্রে শিব, পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। পায়ের কাছে মহিষাসুর, সঙ্গে সিংহ, আর প্রতিমার সামগ্রিক বিন্যাসে নানা প্রাণী ও উদ্ভিদের উপস্থিতি। এই আয়োজন যেন জীবনের বহুমাত্রিকতারই প্রতিচ্ছবি। এখানে যুদ্ধ আছে, সংসার আছে, সম্পদ ও বিদ্যা আছে, সাহস ও সৌন্দর্য আছে, শুভ ও অশুভের দ্বন্দ্ব আছে। মানুষকে যেন মনে করিয়ে দেওয়া হয়, জীবন কখনও একরৈখিক নয়। ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ, সংঘাত-সহাবস্থান নিয়েই তার পথচলা।
দুর্গাপ্রতিমার দিকে তাকালে একটি অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে। মা দুর্গা মহিষাসুরের সঙ্গে ভয়ংকর যুদ্ধে লিপ্ত, অথচ তার চার সন্তান যেন নির্বিকার। কার্তিক অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকলেও মায়ের যুদ্ধে সক্রিয় নন, গণেশের মুখে প্রশান্তির আভাস, লক্ষ্মী সম্পদের প্রতীক নিয়ে উপস্থিত, সরস্বতী বীণা হাতে জ্ঞানের প্রতিমূর্তি। এই দৃশ্যের মধ্যে যেন বাঙালি জীবনের এক গভীর দর্শন লুকিয়ে আছে। সংসারে বিপদ আছে, সংগ্রাম আছে, কিন্তু একই সঙ্গে আছে সম্পদ, জ্ঞান, সৌন্দর্য, হাসি ও স্নেহ। জীবনের প্রতিটি উপাদানকে সঙ্গে নিয়েই মানুষকে এগিয়ে যেতে হয়। দেবদেবীর মূর্তি মানুষের কল্পনা, বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই রূপ লাভ করে। মানুষ যুগে যুগে অজানা শক্তির ব্যাখ্যা খুঁজেছে, বিপদের বিরুদ্ধে আশ্রয় চেয়েছে, কল্যাণের আকাক্সক্ষায় দেবদেবীর কল্পনা করেছে। দুর্গার পৌরাণিক আখ্যানেও এই মানবিক প্রয়োজনের প্রতিফলন রয়েছে। মহিষাসুরের অত্যাচারে দেবতারা যখন বিপর্যস্ত, তখন তাদের সম্মিলিত শক্তি থেকে আবির্ভূত হন দেবী। তিনি অশুভের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। এই কাহিনির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো, বিচ্ছিন্ন শক্তি যখন ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন বৃহত্তর বিপদের মোকাবিলা করা সম্ভব হয়। দুর্গার প্রতিমার বিবর্তনেও রয়েছে নানা বৈচিত্র্য। বাংলার কোনো কোনো প্রাচীন মূর্তিতে দেবীর বাহনের পরিচিত সিংহরূপের বদলে অন্য প্রাণীর উপস্থিতি দেখা যায়। দুর্গাপ্রতিমার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো তার সন্তানদের উপস্থিতি। প্রাচীন ভাস্কর্যে দুর্গার সঙ্গে গণেশ ও কার্তিকের উপস্থিতির নিদর্শন পাওয়া গেলেও চার সন্তানসহ আজকের পরিচিত পারিবারিক প্রতিমার রূপ সব সময় এমন ছিল না। সময়ের সঙ্গে দুর্গার পৌরাণিক পরিচয়ের পাশাপাশি বাঙালির পারিবারিক কল্পনা তাকে নতুনভাবে নির্মাণ করেছে। একসময়কার রণরঙ্গিনী দেবী হয়ে উঠেছেন মা, কন্যা ও পরিবারের কেন্দ্রীয় চরিত্র। এই পরিবর্তনকে কেবল পুরাণের ধারাবাহিকতা দিয়ে বোঝা যায় না; এর মধ্যে রয়েছে বাংলার সামাজিক জীবন, মাতৃত্বের ধারণা এবং পারিবারিক আবেগের গভীর প্রভাব।
পৌরাণিক দুর্গা ও লৌকিক দুর্গার মধ্যে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। পৌরাণিক আখ্যানে তিনি অসুরবিনাশিনী, দেবতাদের সম্মিলিত শক্তির প্রতীক। তার হাতে অস্ত্র, তার লক্ষ্য অশুভের বিনাশ। কিন্তু বাঙালির লোকায়ত কল্পনায় তিনি সংসারী নারী, স্নেহময়ী মা, অভিমানী কন্যা। তিনি শ্বশুরবাড়ি কৈলাস থেকে সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়ি আসেন। তার আগমনে মেনকার আনন্দ, তার বিদায়ে মায়ের বুক খালি হওয়ার বেদনা। দেবীর এই পারিবারিক রূপ বাংলার ধর্মীয় কল্পনাকে দিয়েছে অনন্য মানবিকতা। কিন্তু এই মানবিকতার মধ্যেও প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে। দুর্গাকে মা, স্ত্রী ও কন্যার পরিচয়ে আপন করে নেওয়া যেমন তাকে মানুষের কাছে ঘনিষ্ঠ করেছে, তেমনি নারীকে পারিবারিক ভূমিকার মধ্যে দেখার সামাজিক প্রবণতার প্রতিফলনও এতে থাকতে পারে। অন্যদিকে দশভুজা দুর্গা একই সঙ্গে অসীম শক্তি, সাহস ও প্রতিরোধের প্রতীক। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, বিপদের মোকাবিলা করেন, অশুভকে পরাস্ত করেন। এই দুই পরিচয় পাশাপাশি থাকার কারণেই দুর্গা বাঙালির কাছে কেবল ধর্মীয় প্রতিমা নন, নারীর শক্তি ও মানবিকতারও প্রতীক।
মহিষাসুর, রক্তবীজ, চণ্ড, মুণ্ড, শুম্ভ, নিশুম্ভ কিংবা ধূম্রলোচনের মতো অসুরদের কাহিনি অশুভের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পৌরাণিক ভাষা তৈরি করেছে। আধুনিক জীবনে এই আখ্যানের তাৎপর্য খুঁজতে গেলে অসুরকে কোনো নির্দিষ্ট মানুষ বা গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং অসুরের প্রতীকী অর্থকে অন্যায়, হিংসা, প্রতারণা, দুর্নীতি, নারী নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে মানুষের নৈতিক সংগ্রাম হিসেবে দেখা যায়। প্রতিবছর দুর্গাপূজার মধ্য দিয়ে অশুভের বিনাশ কামনা করার অর্থ হতে পারে নিজেদের জীবন ও সমাজ থেকে এসব প্রবণতা দূর করার অঙ্গীকার।
বাঙালির দুর্গাপূজার সবচেয়ে বড় স্বাতন্ত্র্য হলো, এখানে মহাশক্তি ঘরের মেয়ে হয়ে ওঠেন। অন্য অনেক অঞ্চলে দেবী দুর্গা প্রধানত শক্তি ও অসুরবিনাশের প্রতীক হিসেবে পূজিত হলেও বাংলায় তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কন্যার বাপের বাড়ি ফেরার আবেগ। হিমালয় ও মেনকার কন্যা উমা বিয়ের পর কৈলাসে চলে গেছেন। বছর ঘুরে শরৎ এলে মা মেনকার মনে জাগে মেয়েকে কাছে পাওয়ার আকুলতা। এই কাহিনি বাংলার অসংখ্য পরিবারের চেনা অনুভূতির সঙ্গে মিশে গেছে। দূরে থাকা মেয়ের বাড়ি ফেরা, মায়ের অপেক্ষা, পরিবারের মিলন এবং কয়েক দিনের আনন্দের পর বিদায়ের বেদনা, সব মিলিয়ে দুর্গাপূজা হয়ে উঠেছে বাঙালির আত্মপরিচয়ের অংশ।
এই আবেগের প্রকাশ আগমনী ও বিজয়ার গানে, লোকছড়ায়, মণ্ডপের প্রতিমায় এবং মানুষের দৈনন্দিন স্মৃতিতে। ধর্মীয় বিশ্বাসে যারা আস্থাশীল, তাদের কাছে দুর্গা দেবী ও আরাধ্য শক্তি। আর যারা পুরাণকে প্রতীকী কাহিনি হিসেবে দেখেন, তাদের কাছেও দুর্গাপূজা বাঙালির ইতিহাস, শিল্প, সংগীত, পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক মিলনের এক গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এই বহুমাত্রিকতাই দুর্গাপূজাকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে।
দুর্গাপূজার আনন্দ তাই কেবল চার দিনের নয়। এটি মানুষকে নতুন করে বাঁচার সাহস জোগায়, সম্পর্কের মূল্য মনে করিয়ে দেয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা দেয়। জীবনের অসুরগুলোকে জয় করার শক্তি খুঁজে নেওয়ার আহ্বান জানায়। যে সমাজে মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়ায়, ভিন্নতাকে সম্মান করে এবং দুর্বল মানুষের আনন্দ ও নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করে, সেই সমাজেই উৎসব তার প্রকৃত অর্থ খুঁজে পায়।
বাঙালির দুর্গা তাই একাধারে পুরাণের মহাশক্তি, শিল্পীর কল্পনা, মায়ের আদরের মেয়ে এবং মানুষের সম্মিলিত আবেগের প্রতিচ্ছবি। তিনি আসেন, কয়েক দিনের জন্য ঘর ভরিয়ে দেন, তারপর ফিরে যান কৈলাসে। রেখে যান আনন্দের স্মৃতি, বিদায়ের বিষাদ এবং আবার ফিরে আসার প্রতীক্ষা। সেই প্রতীক্ষার মধ্যেই বাঙালি খুঁজে পায় আগামী দিনের আশা।
দুর্গাপূজার মূল তাৎপর্য এখানেই। অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয়, বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে মিলন, হতাশার বিরুদ্ধে আশা এবং কঠোরতার বিরুদ্ধে মমতা। দেবীর কাছে প্রার্থনা হোক, আমাদের ঘর ও সমাজের অশুভ শক্তি দূর হোক, মানুষের জীবনে ফিরে আসুক শান্তি, সাম্য ও আনন্দ। সবাই মিলে নিরুপদ্রবে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিতে পারলেই দুর্গাপূজা হয়ে উঠবে সত্যিকার অর্থে সর্বজনীন, মানবিক এবং বাঙালির নিজস্ব উৎসব।
চিররঞ্জন সরকার : কলাম লেখক
মতামত লেখকের নিজস্ব
