প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে কিসের ইঙ্গিত? জামায়াতের প্রতিক্রিয়া কী?
চ্যানেল আই অনলাইনপ্রকাশ:
দেশের বাইরে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী শক্তির সঙ্গে দেশের একটি রাজনৈতিক দলের গোপন সমঝোতা এবং অর্থনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেছেন, পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ সরবরাহ করছে, আর সেই অর্থের সহায়তায় দেশের ভেতরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে একটি রাজনৈতিক দল। শুধু রাজনৈতিক অস্থিরতা নয়, বিভিন্ন শিল্পকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির পেছনেও এই দুই পক্ষের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যে সরাসরি কোনো দলের নাম উল্লেখ করা না হলেও বক্তব্যের বিভিন্ন ইঙ্গিত থেকে রাজনৈতিক মহলে মনে করা হচ্ছে, তার অভিযোগের লক্ষ্য মূলত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে রাজশাহীর জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের কয়েকটি স্থানে কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ তৈরির চেষ্টা হয়েছে এবং এর নেপথ্যের বিষয়ে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। তার ভাষায়, “একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে, আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করছে।”
প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, নির্বাচনের আগে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা একটি রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী পক্ষের সমঝোতা হয়েছে। জনগণকে এ ধরনের তৎপরতার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের যে উদ্যোগ

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, তিনি অভিযোগটি সাধারণ রাজনৈতিক ধারণা বা সন্দেহ হিসেবে উপস্থাপন করেননি। বরং গোয়েন্দা সংস্থার সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকার দাবি করেছেন। রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের মুখ থেকে এমন অভিযোগ আসার গুরুত্ব স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। কারণ বিদেশ থেকে কোনো রাজনৈতিক দলকে অর্থায়ন করে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করা হলে তা শুধু দলীয় রাজনীতির বিষয় থাকে না; রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা এবং প্রচলিত আইন প্রয়োগের বিষয়েও পরিণত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের হাতে যখন সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তখন সেই তথ্যের ভিত্তিতে কী ধরনের তদন্ত বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিদেশ থেকে অর্থ আসার অভিযোগ সত্য হলে অর্থের উৎস, লেনদেনের পথ, প্রাপকের পরিচয় এবং ওই অর্থের ব্যবহার শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ শিল্পকারখানার শ্রমিক অসন্তোষকে ঘিরে। তার অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হয়েছে। সরকার যখন বন্ধ কলকারখানা চালু এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন একটি মহল পরিকল্পিতভাবে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। রাজশাহীর জনসভায় তিনি জানান, গত সাত মাসে ছয়টি বন্ধ কলকারখানা চালু করা হয়েছে এবং আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে আরও প্রায় ৪৬টি বন্ধ কারখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী একদিকে সরকারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে সম্ভাব্য রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রকে সেই প্রচেষ্টার প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
তবে শ্রমিক অসন্তোষের প্রশ্নটি বহুমাত্রিক। বকেয়া মজুরি, কর্মপরিবেশ, চাকরির নিরাপত্তা, কারখানা বন্ধ হওয়া কিংবা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মতো বাস্তব কারণেও শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় বাইরে থেকে উসকানি বা অর্থায়নের অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে শ্রমিকদের প্রকৃত দাবি ও সমস্যাগুলোও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। অন্যথায় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগের আড়ালে শ্রমিকদের ন্যায্য অসন্তোষ উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে অভিযোগে সরাসরি নাম উল্লেখ না থাকলেও জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরেই রাজনৈতিক আলোচনা বেশি হচ্ছে। কারণ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের আগে মিথ্যা প্রচারণা এবং বিভিন্ন ধরনের ‘টিকিট’ বিক্রির প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি তিনি অতীতেও আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার অভিযোগ করেছেন। গত ১ অক্টোবরও এক বক্তব্যে তিনি এই দুই রাজনৈতিক শক্তি আবার এক হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন। অর্থাৎ রাজশাহীর বক্তব্য কোনো বিচ্ছিন্ন মন্তব্য নয়; বরং বিরোধী দলের একটি অংশের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ধারাবাহিক সমালোচনার আরও কঠোর প্রকাশ হিসেবে একে দেখা যায়।
প্রধানমন্ত্রী রাজশাহীর বক্তব্যে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গও এনেছেন। তিনি বলেন, বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান; উভয়ের চেতনাকে ধারণ করে। ঢাকার ওসমানী উদ্যানে জুলাই আন্দোলনের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়েও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকার সমালোচনা করেন তিনি। জামায়াতকে ইঙ্গিত করে তিনি অভিযোগ করেন, ১৯৭১ সালের মতো ২০২৪ সালের আন্দোলনের ক্ষেত্রেও দলটির বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের মধ্যে অসংগতি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্য রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও বিস্তৃত করেছে। কারণ এতে বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তরাধিকার নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের মূল বিষয় দুটি: ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্ভাব্য রাজনৈতিক যোগসাজশ এবং বিদেশ থেকে অর্থ নিয়ে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা।

তবে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার পাল্টা অভেোযাগ করে বলেছেন, দেশকে অরাজকতার মধ্যে ঠেলে দিয়ে আওয়ামী লীগকে রাজনীতির মাঠে সুযোগ করে দিচ্ছে সরকার। এর পরিণতি মোটেও ভালো হবে না।
সরকারের অপকর্ম, দুর্নীতি ঢাকতে বিরোধীদলের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে অভিযোগ করে তিনি বলেছেন, ভারতের সাথে সম্পর্ক ভালো করে ভেতরে আওয়ামী লীগের রূপ ধারণ করেছে বিএনপি।
জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল আরো বলেছেন, জুলাইকে ধারণ করলে গণভোটের রায় প্রত্যাখ্যান করতো না বিএনপি। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে রাজপথে কঠোর আন্দোলন শুরুর হুমকি দিয়েছেন তিনি।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
