আইন পেশা থেকে জাতিসংঘের সভাপতির কার্যালয়ে দায়িত্ব—৩১তম জন্মদিনে আলোচনায় তাঁর শিক্ষা, কর্মদক্ষতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বিশেষ প্রতিবেদন।।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কয়েকটি পরিবারের ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে। সেই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নতুন প্রজন্মের পরিচিত মুখ ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। তবে তাঁকে ঘিরে আগ্রহের জায়গাটি এখন শুধু পারিবারিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নেই। আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ে আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবনে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা।
২৫ অক্টোবর তাঁর ৩১তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে তাঁকে নিয়ে শুভেচ্ছা ও আলোচনার পাশাপাশি সামনে এসেছে তাঁর শিক্ষা, পেশাগত প্রস্তুতি, সামাজিক উন্নয়নে আগ্রহ এবং ভবিষ্যৎ পথচলার সম্ভাবনা। রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তাঁকে পরিচিতি দিয়েছে—কিন্তু সেই পরিচয়ের বাইরে নিজের কাজের মাধ্যমে কতটা স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তুলতে পারবেন, সেটিই সময়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আইনশিক্ষা ও পেশাগত প্রস্তুতি
জাইমা রহমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমানের একমাত্র কন্যা। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নাতনি। বাংলাদেশের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ এক পরিবারের সদস্য হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই তাঁকে ঘিরে জনপরিসরে আগ্রহ রয়েছে।
তবে তাঁর শিক্ষাজীবন ও পেশাগত প্রস্তুতির দিকে তাকালে দেখা যায়, আইনকে কেন্দ্র করেই তিনি নিজের কর্মক্ষেত্র তৈরি করেছেন। লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি থেকে আইন ও রাজনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। পরে যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী আইনি প্রতিষ্ঠান ইনার টেম্পল থেকে ব্যারিস্টারি করার যোগ্যতা অর্জন করেন।
আইন পেশায় প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার পাশাপাশি প্রয়োজন যুক্তি বিশ্লেষণ, আইনি কাঠামো বোঝা, তথ্য যাচাই এবং জটিল পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা। জাইমার শিক্ষা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা তাঁকে এসব ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যে আবাসন, সামাজিক কল্যাণ ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত আইনি বিষয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। বাংলাদেশেও তিনি আইন প্রতিষ্ঠান সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে কাজ করেছেন। সেখানে সাংবিধানিক, করপোরেট ও বাণিজ্যিক আইন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং করসংক্রান্ত বিষয়ে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের আইনজীবী তালিকাভুক্তির প্রথম ধাপের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার তথ্যও তাঁর পেশাগত যাত্রায় বাংলাদেশের সঙ্গে সংযোগের বিষয়টি তুলে ধরে।
জাতিসংঘের সভাপতির কার্যালয়ে দায়িত্ব
জাইমা রহমানের কর্মজীবনে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত সংযোজন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির কার্যালয়ে আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন। জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের প্রকাশিত কর্মকর্তাদের তালিকায় তাঁর নাম ও পদবি উল্লেখ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ পরিসর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। এর সভাপতির কার্যালয়ে আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাঠামোর মধ্যে আইনি ও নীতিসংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন জাইমা।
এই দায়িত্বকে তাঁর পেশাগত জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে দেখা যায়। তবে কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনই কারও সামগ্রিক দক্ষতা বা ভবিষ্যৎ সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি নয়। দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা, কাজের মান এবং অর্জিত দক্ষতাকে কীভাবে পরবর্তী সময়ে কাজে লাগানো যায়, তার ওপরই দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়ন নির্ভর করবে।
সামাজিক উন্নয়ন ও শিক্ষায় আগ্রহ
পেশাগত কাজের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন জাইমা রহমান। তিনি বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা সুরভীর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। সুবিধাবঞ্চিত ও বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে কাজ করে সংস্থাটি।
জাইমার আগ্রহের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে সুশাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক জননীতি, বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ, শিক্ষা, লিঙ্গসমতা, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি। এসব বিষয় আধুনিক সমাজের উন্নয়ন ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং বিচারপ্রাপ্তির পথ সহজ করা—দুটি ক্ষেত্রেই সামাজিক বৈষম্য কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এসব বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ভবিষ্যতে কী ধরনের কাজের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়, তা দেখার বিষয়। আগ্রহকে বাস্তব অবদানে রূপ দিতে হলে দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততা, কার্যকর উদ্যোগ এবং অর্জনের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
জনপরিসরে উপস্থিতি ও রাজনৈতিক আলোচনা
জাইমা রহমানের পরিচিতি ও জনপরিসরে উপস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা নতুন নয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট অনুষ্ঠানে বিএনপির প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে অংশ নেওয়ার পর তিনি নতুন করে আলোচনায় আসেন। ২০২৬ সালে জাতিসংঘের সভাপতির কার্যালয়ে তাঁর দায়িত্ব সেই আলোচনায় আন্তর্জাতিক পেশাগত অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ যুক্ত করেছে।
তাঁকে নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সম্ভাবনা নিয়েও নানা প্রত্যাশা প্রকাশ করা হচ্ছে। বিএনপি নেত্রী ও সংসদ সদস্য মানসুরা আলম তাঁকে ‘আগামী দিনের বাংলাদেশের স্ট্র্যাটেজিক লিডার’ হিসেবে উল্লেখ করে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
তবে রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হওয়া এবং সক্রিয় রাজনৈতিক নেতৃত্বে আসা এক বিষয় নয়। জাইমা রহমান ভবিষ্যতে রাজনীতিতে কতটা যুক্ত হবেন, কী ধরনের ভূমিকা নেবেন কিংবা আদৌ নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন কি না—এসব বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনো নেই। তাই তাঁকে ঘিরে সম্ভাবনার আলোচনা এবং বাস্তব রাজনৈতিক অবস্থানকে পৃথকভাবে দেখা জরুরি।
জন্মদিনে বগুড়ায় স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার্থীদের সহায়তা
জাইমা রহমানের ৩১তম জন্মদিন উপলক্ষে বগুড়ায় স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার্থীদের সহায়তামূলক কর্মসূচি আয়োজনের খবরও সামনে এসেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের উদ্যোগে দুই দিনব্যাপী এসব কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
২৪ অক্টোবর মোকামতলার সৈয়দপুর উচ্চবিদ্যালয় মাঠে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় দুই হাজার মানুষ চিকিৎসাসেবা নেন এবং প্রায় ৬০০ ছানিপড়া রোগীকে বিনামূল্যে অস্ত্রোপচারের জন্য বাছাই করা হয়। রোগীদের ওষুধ ও চশমা দেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল।
২৫ অক্টোবর শিবগঞ্জ পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে শিবগঞ্জ ও মোকামতলা এলাকার ৫৪৮ জন ছাত্রীর হাতে গোলাপি রঙের বাইসাইকেল তুলে দেওয়ার কর্মসূচি নেওয়া হয়। একই অনুষ্ঠানে ১ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থীকে জাইমা রহমানের ছবি সংবলিত স্মারক মগ দেওয়ার কথাও জানা গেছে।
এসব উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার্থীদের সহায়তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে কর্মসূচিগুলোর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ধারণে সেবাপ্রাপ্ত মানুষের অভিজ্ঞতা, কার্যকারিতা এবং ধারাবাহিকতা মূল্যায়ন প্রয়োজন।
উত্তরাধিকার পরিচিতি দেয়, স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে কাজ
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার জনপরিচিতি তৈরি করতে পারে, আবার প্রত্যাশা ও সমালোচনার চাপও বাড়াতে পারে। জাইমা রহমানের ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। তাঁর পারিবারিক পরিচয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত; একই সঙ্গে তাঁর নিজস্ব শিক্ষা ও পেশাগত প্রস্তুতির একটি স্বতন্ত্র ধারাও রয়েছে।
একজন মানুষের মূল্যায়নে পারিবারিক পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত দক্ষতা, পেশাগত সততা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং সমাজে তাঁর কাজের বাস্তব প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন। জাইমা রহমানের ক্ষেত্রেও এসব মানদণ্ডই ভবিষ্যতে তাঁর অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
তাঁর সামনে রয়েছে আইন ও নীতিসংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞতা বাড়ানোর সুযোগ, সামাজিক উন্নয়নের উদ্যোগে অবদান রাখার সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্র। এসব সম্ভাবনা কতটা বাস্তব সাফল্যে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ও অর্জনের ওপর।
৩১তম জন্মদিনে নতুন প্রত্যাশা
জন্মদিন ব্যক্তিগত জীবনের একটি উপলক্ষ হলেও জনপরিসরে পরিচিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে তা তাঁদের কাজ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে। জাইমা রহমানের ৩১তম জন্মদিনও তার ব্যতিক্রম নয়।
আইনশিক্ষা, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে পেশাগত অভিজ্ঞতা, জাতিসংঘের সভাপতির কার্যালয়ে দায়িত্ব এবং সামাজিক উন্নয়নে আগ্রহ—এসব মিলিয়ে তাঁর সামনে একটি বিস্তৃত কর্মপরিসর রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই অভিজ্ঞতাগুলোকে তিনি কীভাবে আরও সমৃদ্ধ করেন এবং সমাজের জন্য কতটা কার্যকর অবদান রাখতে পারেন।
পরিবারের উত্তরাধিকার তাঁকে পরিচিত করেছে; কিন্তু নিজের পরিচয়কে আরও দৃঢ় করতে হলে প্রয়োজন ধারাবাহিক কাজ, পেশাগত উৎকর্ষ এবং মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার সক্ষমতা। জাইমা রহমানের আগামী দিনের পথচলা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও এই বিষয়গুলোই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
৩১তম জন্মদিনে তাঁর জন্য শুভকামনা—জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তাঁর পেশাগত যাত্রা আরও সমৃদ্ধ হোক এবং সমাজের কল্যাণে কাজ করার সুযোগ বিস্তৃত হোক।
