Published on
:
2 min read
‘আমারও তো বয়স হচ্ছে, রাতবিরেতে কাশি/ কাশির দমক থামলে কিন্তু বাঁচতে ভালোবাসি।’
কলকাতা থেকে চিনের কুনমিংয়ের দূরত্ব প্রায় হাজার হাজার মাইল। ওয়াং ইং কবীর সুমনের এই গান শোনেননি। শোনার কথাও নয়। তবে তিনিও বাঁচতে ভালোবাসেন খুব। ছুঁয়ে দেখতে ভালোবাসেন জীবনের সাত রং। থাইরয়েড ক্যান্সারের সামনে তাই মাথা নত করেননি। বরং মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবনের দিকে তাক করে ধরেছেন ক্যামেরাটা।
সামনে বরফের রাজ্য আন্টার্কটিকা। সোয়েটার, জ্যাকেট ভেদ করে ঠান্ডা হাওয়ায় হাড় পর্যন্ত কেঁপে উঠছে। তার মধ্যে ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে ৬৭ বছরের ওয়াং। চোখেমুখে অপেক্ষা। মা পেঙ্গুইন সমুদ্র থেকে মাছ ধরে এনে ছানার মুখে তুলে দেবে। সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করবেন তিনি। এটুকুই তাঁর চাওয়া।
সব পর্যটকরা ফিরে গিয়েছেন। বরফের রাজ্যে একা দাঁড়িয়ে ওয়াং। অপেক্ষা করছেন। তাঁর বয়স ৬৭। শরীরে বাসা বেঁধেছে মারণ রোগ। কিন্তু সেই সব মাথায় নেই তাঁর। কোনও যন্ত্রণা ছুতে পারছে না তাঁকে। সব মনোযোগ উত্তল লেন্সে।
গুটিগুটি পায়ে সমুদ্র থেকে উঠে এল মা পেঙ্গুইন। মুখে মাছ। কালো ডানা ঝাপটে ছুটে এল ছানা। সন্তানের মুখে মাছ তুলে দিল মা পেঙ্গুইন। ক্লিক ক্লিক ক্লিক...। তিনি পেরেছেন। ওয়াংয়ের মুখে অনাবিল হাসি। চোখমুখ থেকে যেন তৃপ্তি চুঁইয়ে পড়ছে। এই মুহূর্তের জন্যই তো এত আয়োজন।
এই ছবির পিছনে লুকিয়ে রয়েছে একটা আস্ত জীবন। তার জন্য ফিরে যেতে হবে ২০১৩-য়। স্কুলের প্রশাসনিক পদ থেকে তখন অবসরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ওয়াং। ঠিক সেই সময়ে ধরা পড়ল থাইরয়েড ক্যান্সার। চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, দ্রুত অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। কিন্তু ওয়াংয়ের মন সায় দিল না। তিনি ভাবতে বসলেন, এর পরে? এই রোগ নিয়ে বাকি জীবনটা কী ভাবে কাটাবেন তিনি?
‘নাহ। মরতে হলে দূরে কোথাও গিয়ে মরব।’ মনে মনে বিড়বিড় করে উঠেছিলেন ওয়াং। এই ভাবনার মধ্যে হয়তো কিশোরীর মতো অভিমান ছিল। ছিল নিজের মতো করে বাঁচার একগুঁয়ে ইচ্ছা। শুধু দায়-দায়িত্ব পালন করতে করতেই তো কাটল এতগুলো বছর। এ বার নিজের মতো, নিজের শর্তে বাঁচা যাক।
ওয়াং শখের ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার। আন্টার্কটিকায় যাওয়ার ইচ্ছা তাঁর বহুদিনের। ১,২০০-রও বেশি প্রজাতির পাখি ক্যামেরাবন্দি করেছেন তিনি। কিন্তু পেঙ্গুইনদের দেশে যাওয়া হয়নি এখনও। সেই অপূর্ণ ইচ্ছেটাই তখন তাঁর জীবনের একমাত্র স্বপ্ন।
কিন্তু খরচ তো কম নয়। প্রায় ১ লক্ষ ৫০ হাজার ইউয়ান। নিজের সঞ্চয় ভেঙেও সবটা জোগাড় হলো না। এগিয়ে এল মেয়ে। তার পরে লোটাকম্বল নিয়ে বরফের রাজ্যে পাড়ি দিলেন ওয়াং।
অবশেষে এল সেই মুহূর্ত। ছানার মুখে মাছ তুলে দেওয়ার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করলেন তিনি। জেদ, অপেক্ষা আর স্বপ্নপূরণের আনন্দ মিলেমিশে একাকার। সঙ্গে অদ্ভুত এক তৃপ্তি। একেই বোধহয় জীবন বলে!
কিন্তু তার পরে যা হলো, সেটা স্বপ্ন। নাকি মায়া? এক মাসের আন্টার্কটিকা অভিযান সেরে কুনমিং ফিরলেন তিনি। তার পরে সোজা হাসপাতাল। স্ক্যান করালেন। পরীক্ষা হলো। চিকিৎসকেরা আগের স্ক্যানের সঙ্গে নতুন রিপোর্ট মিলিয়ে দেখে অবাক। টিউমার ছোট হয়ে গিয়েছে।
সাংহাই মর্নিং পোস্ট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিকিৎসকরা আপাতত তাঁর অস্ত্রোপচার পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে নিয়মিত পরীক্ষা করা হবে। নজরদারিতে রাখা হবে ওয়াংকে। কিন্তু কীভাবে টিউমার ছোট হয়ে গেল? তৃপ্তি, মানসিক প্রশান্তি কি ক্যান্সারের মতো মারণরোগের অব্যর্থ ওষুধ হতে পারে?
না। এসব নিছকই কল্পনা মাত্র। এমন ধারণার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তবে ওয়াংয়ের প্রাপ্তির ঝুলিটা আরও বড়। তিনি শুধু ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়াননি। তিনি ফিরে পেয়েছেন বাঁচার মানে, ‘এসো তাকাবো না আর দূরে/ এসো বাঁচি এই লহমায়/ এসো ক্ষণিকের এই সুরে/ এসো জীবন যে চলে যায়!’
ওয়াং বুঝেছেন, জীবন মানে মুহূর্তে বাঁচা। এটাই সত্যি। তিন সত্যি।
