অলিভার কানকে মনে আছে?
স্মৃতির পাতা থেকে ২০০২ বিশ্বকাপ ফাইনালটা সবার আগে উঠে আসার কথা। কানের সেই ভুল যে ভোলা কঠিন! অথচ সেবার ফাইনালের আগে জার্মান কিংবদন্তি দেখিয়ে দেন, গোলকিপারও বিশ্বকাপে পারফরম্যান্সে সবাইকে ছাপিয়ে যেতে পারেন। ভীষণ আগ্রাসী এক ‘দেয়াল’ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন জার্মানির পোস্টে।
কিন্তু ফাইনালে রিভালদোর শট হাতে রাখতে না পেরে ফিরতি শটে রোনালদোর গোল হজমে কানের সব অর্জন মাটি হয়ে যায় দর্শকের কাছে। অথচ সেবার গোল্ডেন বলজয়ী কান আজও পর্যন্ত বিশ্বকাপে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারজয়ী একমাত্র গোলকিপার। ২০০২ ব্যালন ডি’অরেও হয়েছিলেন তৃতীয়। ব্রাজিলের বিপক্ষে সেই ফাইনালের ফল অন্য রকম হলে কানও হয়তো তৃতীয় না হয়ে প্রথম হতেন, অর্থাৎ ব্যালন ডি’অর জিততেন। তখন ১৯৬৩ সালে লেভ ইয়াশিনের পর ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কারজয়ী দ্বিতীয় গোলকিপার হতেন কান।
২০১১ ব্যালন ডি’অর পুরস্কারেও তৃতীয় হওয়া কানের সে বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স গোলকিপারদের ব্যালন ডি’অর জয়ের দাবিকে জোরালো করে তোলে। কিন্তু পজিশনটাই যেন ‘থ্যাংকলেস জব’—গোটা ম্যাচে বুক চিতিয়ে সব ঠেকানোর পরও সামান্য ভুলে গোল হজম করলে গেল গেল রব ওঠে! তখন প্রশ্ন ওঠে একটু অন্যভাবে। আক্রমণভাগে খেলোয়াড়েরাও তো ভুল করেন। তাহলে গোলকিপাররা কেন ব্যালন ডি’অর জয়ে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের সঙ্গে পিছিয়ে পড়বেন?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বোঝা যায়, ফুটবল কীভাবে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স পরিমাপ করে, উদ্যাপনের জন্য ঠিক কী বেছে নেওয়া হয় এবং গোলকিপারদের অবদান মূল্যায়ন করা কেন কঠিন?
সেই খোঁজের আগে একটি তথ্য আগেভাগে জানিয়ে রাখা যাক। এবার ব্যালন ডি’অর পুরস্কারে মনোনীত ৩০ জনের মধ্যে নেই কোনো গোলকিপার। অর্থাৎ ২৬ অক্টোবর লন্ডনে ব্যালন ডি’অর হাতে কোনো গোলকিপারকে দেখার সুযোগ নেই।
ইয়াশিনের পর পুরস্কারটি জয়ে কাছাকাছি পৌঁছেছেন কেউ কেউ। কিন্তু ইয়াশিনের পুনরাবৃত্তি আর হয়নি। ইতালি কিংবদন্তি দিনো জফ যেমন ১৯৭৩ সালে ব্যালন ডি’অর জয়ে দ্বিতীয় হন। জুভেন্টাসের দুর্দান্ত তো ছিলেনই, এর পাশাপাশি ইতালির পোস্টে ১০৪২ মিনিট গোল হজম করেননি জফ। ইতালি ২০০৬ বিশ্বকাপ জয়ের পর সে বছর ব্যালন ডি’অরে দ্বিতীয় হন জিয়ানলুইজি বুফন। জার্মানি বিশ্বকাপ জেতার পর ২০১৪ ব্যালন ডি’অরে দ্বিতীয় হন ম্যানুয়েল নয়্যারও।

প্রতিটি উদাহরণই বলে দেয়, গোলকিপারদেরও বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। জফ তাঁর সময়ে ধারাবাহিকতা ও রক্ষণাত্মক দক্ষতার প্রতীক। বিশ্বকাপে কীভাবে সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা যায়, সেটা দেখিয়েছিলেন কান। বুফনের শট ঠেকানোর ক্ষমতা ছিল অবিশ্বাস্য। নয়্যার আরও এক ধাপ এগোনো। শুধু গোল ঠেকানো নয়, বক্সের বাইরে পাস দেওয়ার সঙ্গে সুইপারের ভূমিকাও নিয়েছেন।
অথচ তাঁদের কেউ ব্যালন ডি’অর জিততে পারেননি।
ফুটবলে গোলই শেষ কথা। বল জালে জড়ালে গ্যালারি গর্জে ওঠে। কিন্তু ধরুন সেই গোলের কয়েক মুহূর্ত আগে কোনো গোলকিপার অবিশ্বাস্য সেভ করলে ততটা গর্জে না। ম্যাচের শেষ মিনিটে কোনো ফরোয়ার্ডের গোলই হয়তো শিরোনাম হয় পরের দিন দৈনিকে। সে ম্যাচেরই হয়তো ৫০ মিনিটে গোলকিপারের অবিশ্বাস্য সেভ হয় সেই ম্যাচেরই প্রতিবেদনে বর্ণনায় বিষয়। কিংবা পটভূমি অথবা প্রেক্ষাপট। ব্যক্তিগত পুরস্কার জয়ে এসব প্রেক্ষাপট তৈরি অবশ্য খুব একটা কাজে লাগে না। ব্যাপারটা শুধু মূল্যায়ন নয়, পারফরম্যান্স পরিমাপকের ক্ষেত্রেও সমস্যা।
আক্রমণে অবদান বোঝা যায় গোল ও অ্যাসিস্টে (গোল বানানো)। গোলকিপারের কাজ এর চেয়ে জটিল। প্রত্যাশিত গোল (এক্সপেক্টেড গোল) মডেল মাঠে দলগুলোর তৈরি করা সুযোগের মান বুঝতে সাহায্য করেছে। আর শট-পরবর্তী প্রত্যাশিত গোলগুলোয় অনুমান করা যায় যে একজন গোলরক্ষক মুখোমুখি হওয়া শট এবং সেগুলোর পজিশন বিবেচনায় কতগুলো গোল আটকিয়েছেন। কিন্তু এগুলো ফুটিয়ে তুলতে ব্যাখ্যার প্রয়োজন আর গোলকিপার দলে যা কিছু অবদান রাখেন, তার সবটুকু এসব মেট্রিকস পুরোপুরি ফুটিয়ে তুলতে পারে না।
ধরুন, একজন গোলকিপার যিনি প্রতিপক্ষের থ্রু পাস আগেই বুঝতে পেরে এগিয়ে যান এবং কেউ শটটি নেওয়ার আগেই বল বিপদমুক্ত করেন। এতে হয়তো কোনো সেভ থাকে না, কোনো হাইলাইটস হয় না এবং তাৎক্ষণিকভাবে চোখে পড়ার মতো কোনো পরিসংখ্যানও থাকে না। তবু সিদ্ধান্তটি কোনো দুর্দান্ত ওয়ান-অন-ওয়ান সেভের মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। গোলরক্ষক বিপদ আঁচ করতে পেরে আগেই পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু ম্যাচে এসব অবদানের প্রভাব কতটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যতটা মানুষের মুখে মুখে ঘোরে গোল ও অ্যাসিস্টের সংখ্যা?
একই কথা খাটে গোলকিপারের পজিশনিং, যোগাযোগ, বল বিতরণ এবং রক্ষণভাগের পেছনের জায়গার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষেত্রেও। বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে না দেওয়া, আগেই বিপদ টের পেরে পদক্ষেপ নেওয়া—গোলকিপারদের এসব অবদান কতটা ফুটিয়ে তোলা হয়?
একজন ফরোয়ার্ডের অবদান দৃশ্যমান এবং তা সহজে প্রকাশও করা যায়। অন্যদিকে একজন গোলরক্ষকের প্রভাব মূলত প্রতিরোধমূলক, সূক্ষ্ম এবং পুরো ৯০ মিনিটে বিভিন্ন সিদ্ধান্তের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে।

মানসিক দিকও আছে। নটিংহাম ফরেস্টে পিটার শিলটনের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন কিংবদন্তি কোচ ব্রায়ান ক্লফ। তাঁর দাবি ছিল, ভালো গোলকিপার মৌসুমে দলকে ১৫ থেকে ২০ পয়েন্ট পাইয়ে দেন। ক্লফ বুঝতে পেরেছিলেন, শিলটনের মানের গোলকিপার দলের বাকি খেলোয়াড়দের মনে আত্মবিশ্বাস জোগাতেন। ডিফেন্ডাররা নিজেদের বেশি নিরাপদ মনে করতেন এবং আরও আগ্রাসীভাবে খেলতে পারতেন। কারণ, তাঁরা জানতেন পেছনের একজন ত্রাতা আছেন। ফরোয়ার্ডরা বিশ্বাস করতেন, ম্যাচ জেতার জন্য হয়তো একটি গোলই যথেষ্ট।
দল চাপে থাকলে একটি দুর্দান্ত সেভ দলের অন্যদের শান্ত রাখতে পারে। প্রতিপক্ষ একের পর এক ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে গোল করতে না পারলেও চাপে পড়ে। এসব প্রভাবের হিসাব রাখা কঠিন। আর সমস্যা হলো, এ কাজের বেশির ভাগই পরোক্ষ। ম্যাচ-পরবর্তী আলোচনায় হয়তো এসব আসে না। কিন্তু দেখা যায়, ওই ম্যাচের প্রতিটি ধাপেই গোলকিপারের অবদান ছিল।
আক্রমণভাগের একজন খেলোয়াড় বেশ কয়েকটি সুযোগ হাতছাড়া করতে পারেন, ম্যাচে বেশির ভাগ সময় নিষ্ক্রিয় থাকতে পারেন এবং শেষ মুহূর্তে জয়সূচক গোল করে ঠিকই ম্যাচের নায়ক বনে যেতে পারেন। পক্ষান্তরে একজন গোলরক্ষক ৮৯ মিনিট ধরে দুর্দান্ত পারফর্ম করেও কেবল একটি ভুলের কারণে নিজের পুরো পারফরম্যান্সের গৌরব হারাতে পারেন। ২০০২ বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে কানের সেই ভুলটি এর নিখুঁত উদাহরণ।

ব্যক্তিগত পুরস্কার অর্জনে যে ধারাবাহিক গল্প তৈরি করা প্রয়োজন, গোলরক্ষকদের জন্য তা কঠিন। গোলকিপারদের তাই ছেলেদের ব্যালন ডি’অর জয় করতে দেখা যায় না। এর বদলে ২০১৯ সাল থেকে চালু হওয়া শুধু তাঁদের জন্য ‘ইয়াশিন ট্রফি’ জিততে দেখা যায়।
গোলকিপারদের নিয়ে আলোচনার ধরনেও তাই পরিবর্তন দরকার। ‘ক্লিন শিট’ বা গোলশূন্য ম্যাচগুলোকে দলীয় সাফল্য হিসেবে দেখা হয়। সেটা হয়তো গোলকিপারের শ্রেষ্ঠত্বের নির্ভরযোগ্য পরিমাপক নয়। তবে গোলকিপার কতগুলো গোল প্রতিহত করেছেন, কোন জায়গা নিয়ন্ত্রণ করেছেন, কেমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তাঁর কাজগুলো দলকে কতটা ভিন্নভাবে খেলতে সাহায্য করেছে, এসব হিসাবও এখন জরুরি। করা যে হয় না, তা নয়। তবে গোল ও অ্যাসিস্টের তুলনায় সেসব নিয়ে আলোচনা হয় খুব কমই।
OUR 2026 MEN'S BALLON D'OR NOMINEES! #ballondor https://t.co/GQFsH5u5lO
— Ballon d'Or (@ballondor) September 8, 2026
গোলকিপারের অবদানকে বাকি পজিশনগুলোর সমান নিক্তিতে রেখে তাই পরিমাপ করতে হবে। এটা যত দিন পর্যন্ত হবে না, তত দিন ব্যালন ডি’অর জয়ে গোলকিপাররা কাছাকাছি যেতে পারলেও প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারবেন না। আর এটাই সম্ভবত ব্যালন ডি’অরের সবচেয়ে মর্মান্তিক ব্যাপার—ফুটবলে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর মুহূর্তটি রুখে দেওয়ার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিটি বেশির ভাগ সময় উপেক্ষিতই থেকে যান!
