ইসলামের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ পবিত্র হজ। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ প্রতিবছর মক্কায় সমবেত হন দয়াময় আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের আশায়। তাদের ইবাদত-বন্দেগি, আবেগ, ত্যাগ ও ভ্রাতৃত্বের দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিলেন আফ্রিকার প্রখ্যাত আলোকচিত্রী মোহাম্মদ আমিন। ছবি তোলার জন্য তাকে সৌদি আরবের সরকার সবধরনের সুবিধা প্রদান করে। এমনকি বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াতের জন্য তাকে বিশেষ অনুমতিপত্র দেওয়া হয়।
কেনিয়ার এই মুসলিম আলোকচিত্রী ‘মো আমিন’ নামেও পরিচিত। সত্তরের দশকে সৌদি আরবে হজের বিভিন্ন পর্যায় ও পবিত্র স্থানগুলোর ছবি তোলার সুযোগ পান তিনি। তার আলোকচিত্রে উঠে আসে কাবা শরিফকে ঘিরে তাওয়াফ, বিভিন্ন দেশ থেকে আসা হাজিদের উপস্থিতি এবং হজের আধ্যাত্মিক পরিবেশ। এসব ছবি হজের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে রয়েছে।
পবিত্র দুই মসজিদে আলোকচিত্রের বিরল সুযোগ
মোহাম্মদ আমিনের জীবনের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল মক্কা ও মদিনায় কাজ করার সুযোগ। সৌদি সরকারের অনুমতি নিয়ে তিনি মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববির বিভিন্ন অংশের ছবি তোলেন। সে সময় পবিত্র স্থানগুলোর ভেতরের দৃশ্য ধারণের সুযোগ পাওয়া ছিল বিশেষ ঘটনা। তিনি এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে হজের নানা মুহূর্তকে ক্যামেরায় ধরে রাখেন। মোহাম্মদ আমিনের হজবিষয়ক আলোকচিত্রে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি মানুষের অভিজ্ঞতাও গুরুত্ব পেয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা হাজিদের কাবা শরিফের চারপাশে তাওয়াফ, পবিত্র নগরীতে তাদের সমাগম এবং হজ শেষে ঘরে ফেরার দৃশ্য তার ক্যামেরায় উঠে এসেছে।
সত্তরের দশকে প্রায় তিন বছর ধরে তিনি হজের বিভিন্ন পর্যায়ে ছবি তোলেন। কখনো উট, কখনো হেলিকপ্টার, গাড়ি কিংবা পায়ে হেঁটে তিনি বিভিন্ন স্থানে পৌঁছান। তার এই কাজের উদ্দেশ্য ছিল হজের ব্যাপ্তি, বৈচিত্র্য ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্যকে ছবির মাধ্যমে তুলে ধরা।
নেপথ্যের গল্প থেকে বিশ্বমঞ্চে
মোহাম্মদ আমিনের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২৯ আগস্ট কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে। ছোটবেলা থেকেই ছবি তোলার প্রতি তার আগ্রহ ছিল। মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি একটি পুরোনো ক্যামেরা কেনেন। কৈশোরেই ছবি তোলা ও সংবাদচিত্র ধারণের কাজ শুরু করেন। ১৯৬৩ সালে তানজানিয়ার দারুস সালামে তিনি ক্যামেরাপিক্স নামে একটি আলোকচিত্র সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। পরে সংস্থাটির কার্যক্রম নাইরোবিতে সম্প্রসারিত হয়। আলোকচিত্রের পাশাপাশি সংবাদচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও টেলিভিশন প্রতিবেদনের কাজেও প্রতিষ্ঠানটি পরিচিতি লাভ করে।
তিন দশকের বেশি সময়ের কর্মজীবনে মো আমিন আফ্রিকার যুদ্ধ, রাজনৈতিক সংঘাত, দুর্ভিক্ষ ও সামাজিক পরিবর্তনের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নথিবদ্ধ করেন। তার কাজের বৈশিষ্ট্য ছিল বিপজ্জনক পরিস্থিতিতেও ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরা।
হজের ছবি থেকে ইতিহাসের দলিল
মোহাম্মদ আমিনের তোলা হজের ছবিগুলোর গুরুত্ব কেবল ধর্মীয় অনুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো থেকে কয়েক দশক আগের হজের পরিবেশ, হাজিদের পোশাক, চলাচল, সমাগম এবং পবিত্র স্থানগুলোর দৃশ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ১৯৭৯ সালের তার কয়েকটি বিখ্যাত ছবিতে মসজিদে হারামে কাবা শরিফকে ঘিরে হাজিদের তাওয়াফ এবং মক্কার ধর্মীয় পরিবেশ ফুটে উঠেছে। এসব আলোকচিত্র পরবর্তী সময়ে সংরক্ষিত ও প্রদর্শিত হয়েছে। তার হজবিষয়ক কাজ নিয়ে প্ল্যানিং টু মক্কা (Pilgrimage to Mecca) নামের একটি বইও প্রকাশিত হয়।
আলোকচিত্রের মাধ্যমে মো আমিন এমন এক অভিজ্ঞতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন, যা মুসলমানদের কাছে গভীর ধর্মীয় তাৎপর্য বহন করে। একই সঙ্গে অমুসলিম দর্শকদের কাছেও হজের ব্যাপকতা ও আন্তর্জাতিক চরিত্র সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হয়।
ইথিওপিয়ার দুর্ভিক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি
হজের ছবি ছাড়াও মোহাম্মদ আমিনের কর্মজীবনে আফ্রিকার সংকট ও মানবিক বিপর্যয় নথিবদ্ধ করার বিশেষ ভূমিকা ছিল। ১৯৮৪ সালের ইথিওপিয়ার দুর্ভিক্ষ নিয়ে তার ধারণ করা দৃশ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে তার কাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সংবাদচিত্র ধারণ করতে গিয়ে তিনি একাধিকবার ঝুঁকির মুখে পড়েন। এক দুর্ঘটনায় তার বাম হাত হারাতে হয়। কিন্তু কৃত্রিম হাতের সহায়তায় আবারও মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেন। প্রতিকূলতার মধ্যেও সংবাদ সংগ্রহে ফিরে আসা তার পেশাগত দৃঢ়তার পরিচয় বহন করে।
অসমাপ্ত যাত্রার অবসান
১৯৯৬ সালের ২৩ নভেম্বর ছিনতাই হওয়া ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের ৯৬১ নম্বর উড়োজাহাজ ভারত মহাসাগরে বিধ্বস্ত হলে মোহাম্মদ আমিন মৃত্যুবরণ করেন। তিনি তখনও সাংবাদিকতার কাজেই নিয়োজিত ছিলেন। তার মৃত্যুতে আন্তর্জাতিক সংবাদচিত্র ও আলোকচিত্রজগৎ একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে হারায়। তার রেখে যাওয়া আলোকচিত্র ও ভিডিওর সংগ্রহ আজও ইতিহাস, সাংবাদিকতা ও গবেষণার জন্য মূল্যবান। মোহাম্মদ আমিন ফাউন্ডেশনের সংরক্ষণে থাকা বিপুল আর্কাইভে রয়েছে আফ্রিকা, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের নানা দৃশ্য।
মোহাম্মদ আমিনের জীবন দেখিয়েছে, ক্যামেরা কেবল কোনো দৃশ্য ধারণের যন্ত্র নয়; এটি ইতিহাস সংরক্ষণ এবং মানুষের অভিজ্ঞতা পৃথিবীর সামনে তুলে ধরার শক্তিশালী মাধ্যম। মক্কা-মদিনায় তার তোলা হজের ছবিগুলো তাই শুধু একজন আলোকচিত্রীর কৃতিত্ব নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের স্মৃতিবাহী দলিল।
