বছরের পর বছর শত শত কোটি টাকা লোকসান, একাধিক চিনিকলে উৎপাদন বন্ধ, উৎপাদন খরচের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের বিপুল ব্যবধানÑ সব মিলিয়ে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের সক্ষমতা ও পরিচালনব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে চিনিশিল্পকে বাঁচানোর উদ্যোগ যেমন জরুরি, তেমনি লোকসানের কারণ চিহ্নিত করা এবং প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করাও অপরিহার্য।
বিএসএফআইসির ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আর্থিক চিত্র উদ্বেগজনক। সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, করপোরেশনের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কর-পরবর্তী নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৪৭৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। বিপরীতে আয় হয়েছে ১ হাজার ২২২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, আর ব্যয় ১ হাজার ৫৭৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। ১৫টি রাষ্ট্রীয় চিনিকলের মধ্যে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি মুনাফা করলেও সেই লাভের প্রধান উৎস চিনি উৎপাদন নয়- ডিস্টিলারি, অ্যালকোহল ও অন্যান্য পণ্যের ব্যবসা। অর্থাৎ মূল শিল্পের দুর্বলতা আড়াল হচ্ছে বিকল্প খাতের আয় দিয়ে। রাষ্ট্রীয় চিনিশিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এই বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
এক কেজি চিনি উৎপাদনে যেখানে প্রায় ২৩৭ টাকা ব্যয় হচ্ছে, সেখানে বিক্রয়মূল্য প্রায় ১২৫ টাকা। প্রতি কেজিতে প্রায় ১১২ টাকা লোকসানের এই ব্যবধান শুধু বাজারের প্রতিকূলতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। পুরোনো যন্ত্রপাতি, আখের অপর্যাপ্ত সরবরাহ, উৎপাদনক্ষমতার কম ব্যবহার, অতিরিক্ত জনবল ও প্রশাসনিক ব্যয় এবং ঋণের সুদÑ সবকিছুই পর্যালোচনার দাবি রাখে।
তবে কাঠামোগত দুর্বলতার অজুহাতে ব্যবস্থাপনার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিএসএফআইসির নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, সরঞ্জাম কেনাকাটা ও ঠিকাদারি প্রক্রিয়া নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে করপোরেশনের সচিব মুজিবুর রহমানকে ঘিরে নিয়োগ ও ক্রয়সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।
যদিও অভিযোগের বিষয়ে বিএসএফআইসির সচিব দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
পনেরোটি চিনিকলের মধ্যে ছয়টি চিনিকলে ২০২০ সাল থেকে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণ ও ঋণের সুদসহ বিভিন্ন ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হচ্ছে। এসব কারখানা পুনরায় চালু করা কিংবা বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়ার আগে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাই করা জরুরি। অতীতে বিনিয়োগের উদ্যোগ নিয়ে বিতর্ক ও চুক্তি বাতিলের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। অংশীদার নির্বাচনে আর্থিক সক্ষমতা, ব্যাবসায়িক রেকর্ড, বিনিয়োগ পরিকল্পনা ও ঝুঁকি যাচাই নিশ্চিত করতে হবে। কোনোভাবেই আধুনিকায়নের নামে রাষ্ট্রীয় সম্পদ অস্বচ্ছ চুক্তি বা অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না।
একই সঙ্গে আখচাষিদের ন্যায্যমূল্য ও সময়মতো অর্থ পরিশোধ, উন্নত জাতের আখ চাষে সহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন এবং উৎপাদিত চিনি দ্রুত বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। চিনি উৎপাদনের পাশাপাশি উপজাত পণ্য থেকে আয় বাড়ানোর সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে হবে। প্রতিটি চিনিকলের উৎপাদন ব্যয়, আখ সংগ্রহ, জনবল, ঋণ, সুদ ও বিক্রয়সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং অপচয় রোধ করা সহজ হবে।
রাষ্ট্রীয় চিনিশিল্পকে টিকিয়ে রাখার অর্থ কেবল বন্ধ কারখানার চুল্লি পুনরায় জ্বালানো নয় বরং শিল্পটিকে আর্থিকভাবে টেকসই ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। এ জন্য সরকারকে সময়বদ্ধ সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নিরপেক্ষ নিরীক্ষা ও তদন্তের মাধ্যমে অনিয়মের দায় নির্ধারণ, ক্রয় ও নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং লোকসান কমানোর পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি শিল্পে ব্যর্থতার কারণ অজানা থাকবে, অনিয়মের অভিযোগ নিষ্পত্তিহীন থাকবেÑ এমন পরিস্থিতি চলতে পারে না। লোকসানের বৃত্ত ভাঙতে হলেÑ আধুনিকায়নের পাশাপাশি সর্বাগ্রে নিশ্চিত করতে হবে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।