সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে নজরদারি জোরদার করছে সরকার। এখন থেকে প্রতিটি কর্মদিবসে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যথাসময়ে উপস্থিত হয়ে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু করছেন কিনা, তার তথ্য সংগ্রহ করে উপজেলা থেকে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় পেরিয়ে প্রতিদিন জাতীয় পর্যায়ে প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। এ জন্য প্রধান শিক্ষকদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শিক্ষকদের উপস্থিতির তথ্য পাঠানোর পাশাপাশি হাজিরা খাতার ছবিও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠাতে হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের জারি করা এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে অধিদপ্তরের প্রণীত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনায় শিক্ষকদের উপস্থিতির তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয়ের জন্য উপজেলা পর্যায়ে ক্লাস্টারভিত্তিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এসব গ্রুপের প্রশাসক থাকবেন সংশ্লিষ্ট সহকারী উপজেলা বা সহকারী থানা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। প্রতিদিন সকালে প্রধান শিক্ষকদের পাঠানো তথ্য সমন্বয় করে পর্যায়ক্রমে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে পাঠানো হবে। সবশেষে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ জাতীয় পর্যায়ে দৈনিক প্রতিবেদন তৈরি করে মহাপরিচালকের কাছে উপস্থাপন করবে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরী ছাড়া দেশের অন্যান্য এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের প্রতিদিন সকাল ৯টা ২০ মিনিটের মধ্যে শিক্ষক উপস্থিতির তথ্য সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টারের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পাঠাতে হবে। ঢাকা মহানগরীতে এ সময়সীমা সকাল ৭টা ৫০ মিনিট।
এরপর সহকারী উপজেলা বা থানা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টারের তথ্য সমন্বয় করে সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে উপজেলা বা থানা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠাতে হবে। ঢাকা মহানগরীতে এ ধাপের সময়সীমা সকাল ৮টা ১৫ মিনিট।
উপজেলা বা থানা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে সব ক্লাস্টারের তথ্য একত্র করে সকাল ১০টা ১৫ মিনিটের মধ্যে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত গ্রুপে পাঠাতে হবে। ঢাকা মহানগরীতে এ সময়সীমা সকাল ৮টা ৪৫ মিনিট। জেলা পর্যায়ে সমন্বিত তথ্য সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে বিভাগীয় উপপরিচালকের গ্রুপে পাঠাতে হবে। বিভাগীয় উপপরিচালকরা সব জেলার তথ্য একত্র করে বেলা ১১টা ১৫ মিনিটের মধ্যে অধিদপ্তরের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগে পাঠাবেন।
বিভাগীয় পর্যায়ে নির্ধারিত এক্সেল শিটে তথ্য সংরক্ষণ করে নির্দিষ্ট ই-মেইল ঠিকানায় পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিত শিক্ষকদের নামের তালিকা নির্ধারিত ছকে পাঠাতে হবে।
শুধু বার্তা পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ হবে না প্রধান শিক্ষকদের। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, উপস্থিতির তথ্য পাঠানোর পাশাপাশি শিক্ষক হাজিরা খাতার সংশ্লিষ্ট অংশের ছবি তুলে সহকারী উপজেলা বা থানা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠাতে হবে। মাসিক প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ও পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য এসব ছবি উপজেলা শিক্ষা অফিসে সংরক্ষণ করা হবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, নির্ভুল তথ্য দিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কিংবা প্রধান শিক্ষক ব্যক্তিগতভাবে দায়ী থাকবেন।
শিক্ষাবিদদের মতে, উপস্থিতি পর্যবেক্ষণের সঙ্গে পাঠদানের মান, বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের শিখন অগ্রগতি মূল্যায়ন করা গেলে উদ্যোগটি আরও কার্যকর হতে পারে। শিক্ষকদের ওপর অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক চাপ না বাড়িয়ে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের প্রক্রিয়াও সহজ রাখা প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, শুধু হাজিরার হিসাব সংগ্রহ করলেই শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত হবে না। শিক্ষক বিদ্যালয়ে উপস্থিত থেকেও যথাযথভাবে পাঠদান করছেন কিনা, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কেমন এবং তারা নির্ধারিত শিখনফল অর্জন করছে কিনা— এসব বিষয়ও পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষক অনুপস্থিতির কারণ যাচাই, যৌক্তিক ছুটি বিবেচনা এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
তিনি বলেন, শিক্ষকদের উপস্থিতি নিয়ে দৈনিক নজরদারি প্রাথমিক শিক্ষায় জবাবদিহি বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, এই নজরদারি কাগজে-কলমে উপস্থিতির হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের শেখার মান উন্নয়নেও দৃশ্যমান পরিবর্তন আনে।
অভিভাবকদের প্রত্যাশা প্রসঙ্গে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের চেয়ারম্যান মো. জিয়াউল কবির দুলু আমাদের সময়কে বলেন, এ উদ্যোগের ফলে বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত হবে এবং সন্তানদের শেখার ঘাটতি কমবে। তবে তার জন্য উপস্থিতির তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি বিদ্যালয়ভিত্তিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের ব্যবস্থা নিতে হবে।
