পঞ্চগড়ের আটোয়ারীতে এক টাকায় বিক্রি হচ্ছে এক পিস লাউ। যে লাউ উৎপাদনে কৃষকের খরচ হচ্ছে ৬ থেকে ৭ টাকা, বাজারে তার দাম মিলছে মাত্র ১ থেকে ২ টাকা। অথচ রাজধানী ঢাকার বাজারে একই লাউ কিনতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা। উৎপাদন খরচের চেয়ে কয়েক গুণ কম দামে ফসল বিক্রি করতে গিয়ে দিশেহারা কৃষকেরা। লোকসানের আশঙ্কায় কেউ কেউ ক্ষেত থেকে লাউ তোলাই বন্ধ করে দিয়েছেন। মাচায় ঝুলছে পাকা লাউ, জমিতে পড়ে নষ্ট হচ্ছে সবজি। ভালো ফলনও এখন আটোয়ারীর কৃষকের কাছে পরিণত হয়েছে আর্থিক বোঝায়।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, লাউয়ের মাচাজুড়ে ঝুলছে অসংখ্য লাউ। কৃষকদের ভাষ্য, এবার ফলন গত বছরের তুলনায় ভালো হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেও দাম কমে যাওয়ায় সেই ফলন থেকে লাভের মুখ দেখা তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচের সামান্য অংশও তুলতে পারছেন না তারা। ক্ষেত থেকে লাউ তুলে বাজারে নেওয়ার খরচটুকুও উঠছে না অনেকের। ফলে লাউ সংগ্রহ না করে মাচায় ফেলে রাখছেন কেউ কেউ। সময়মতো বিক্রি করতে না পারায় কিছু লাউ নষ্টও হচ্ছে।
কৃষকদের হিসাবে, জমি তৈরি, হালচাষ, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, মাচা নির্মাণ ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে প্রতি পিস লাউ উৎপাদনে খরচ পড়ে ৬ থেকে ৭ টাকা। অথচ মাঠপর্যায়ে বিক্রি করতে হচ্ছে ১ থেকে ২ টাকায়। এতে প্রতিটি লাউয়ে লোকসান হচ্ছে ৪ থেকে ৬ টাকা। উৎপাদন যত বেশি হচ্ছে, লোকসানের অঙ্কও তত বাড়ছে।
দুই বিঘা জমিতে লাউ চাষ করেছেন উপজেলার কৃষক ফইজুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমি মোট দুই বিঘা জমিতে লাউ চাষ করেছি। দুই বিঘা জমিতে আমার প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার লাউয়ের উৎপাদন ভালো হয়েছে। প্রথম দিকে লাউয়ের দাম কিছুটা ভালো ছিল। কিন্তু বর্তমানে এক টাকায় এক পিস লাউ বিক্রি হচ্ছে। অথচ এক পিস লাউ উৎপাদন করতে আমাদের ৫ থেকে ৭ টাকা খরচ হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা মাঠে মারা যাব।
ঋণ ও ধারদেনা করে লাউ চাষ করা আরেক কৃষক হাফিজ উদ্দিন বলেন, লাউ চাষের জন্য জমি উপযোগী করা, সার, বীজ ও কীটনাশকসহ অনেক খরচ হয়। সময়মতো সার পেতেও আমাদের অনেক কষ্ট হয়েছে। এখন লাউয়ের উৎপাদন ভালো হলেও দাম নেই। ধারদেনা ও ঋণ করে চাষ করেছিলাম। কিন্তু লাভের দাম না থাকায় এখন মাথায় হাত দিতে হচ্ছে।
কৃষকের ক্ষতির বিপরীতে ভোক্তার বাজারে লাউয়ের দাম বেশি থাকার বিষয়টি আরও প্রশ্ন তৈরি করেছে। আটোয়ারীর মাঠে যে লাউ এক থেকে দুই টাকায় বিক্রি হচ্ছে, ঢাকায় সেই লাউয়ের দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা বলে জানা গেছে। তবে উৎপাদনস্থল থেকে রাজধানীর বাজার পর্যন্ত দামের এই ব্যবধানের কতটা পরিবহন, আড়ত, বাজারজাতকরণ ও অন্যান্য ব্যয়ের কারণে এবং কতটা মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফা, তা স্পষ্ট নয়। এ ব্যবধানের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে সরবরাহব্যবস্থা ও বাজারদর খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আটোয়ারীতে পর্যাপ্ত পাইকারি বাজার না থাকাকেও সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। পাইকার বিপ্লব বলেন, আটোয়ারীতে সেরকম কোনো পাইকারি হাট নেই। পঞ্চগড়সহ অনেক জায়গায় লাউয়ের উৎপাদন বেশি হওয়ায় গত বছরের তুলনায় এবার চাহিদা কম। আমরা এখান থেকে লাউ কিনে ঢাকায় নিয়ে গিয়েও লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছি। মাঠপর্যায় থেকে সরাসরি লাউ কিনে ঢাকায় নিয়ে যাই। কিন্তু ঢাকায় বিভিন্ন জেলা থেকেও লাউ সরবরাহ করা হচ্ছে। এ কারণে লাউয়ের চাহিদা আগের তুলনায় অনেক কম।
এ বিষয়ে আটোয়ারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মোস্তাক আহমেদ বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর আটোয়ারী উপজেলায় ব্যাপক পরিমাণ জমিতে লাউ উৎপাদন করা হয়েছে। শুরুতে লাউয়ের কিছুটা চাহিদা থাকলেও পঞ্চগড় জেলাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় লাউ উৎপাদন বেশি হওয়ায় দাম কিছুটা কমেছে।
ফলন ভালো হলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় আটোয়ারীর লাউচাষিদের সামনে এখন উৎপাদন খরচ তোলারই কঠিন চ্যালেঞ্জ। কৃষকের ক্ষেত থেকে ভোক্তার বাজার পর্যন্ত দামের এত বড় ব্যবধানের কারণ নির্ধারণ, স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর পাইকারি বাজার গড়ে তোলা এবং কৃষকের উৎপাদিত সবজির ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে এ লোকসানের বোঝা আরও ভারী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
