বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, ভোক্তা পর্যায়ে এলপি গ্যাসের মূল্য সহনীয় রাখতে সরকার সবরকম চেষ্টা করছে। তবে ভোক্তাদের জিম্মি করে কোনো দাবি আদায়ের চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না। আলোচনার টেবিলেই সমস্যার সমাধান করতে হবে। সেই সঙ্গে তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, এসেনশিয়াল পণ্য নিয়ে ধর্মঘট করার চেষ্টা করলে ১৯৫৬ সালের আইন অনুযায়ী কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিদ্যুৎমন্ত্রীর এমন হুশিয়ারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এলপি গ্যাস ব্যবসায়ীরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
ফলে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)
টানা দুই দিন বিক্রি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলো এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সঙ্গে বৈঠকের পর গতকাল বুধবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন ব্যবসায়ীরা। এদিকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জ্বালানি বিভাগের এলপিজি আমদানিকারককে সঙ্গে একটি বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলন করে মন্ত্রী এলপি ব্যবসায়ীদের হুশিয়ারি দেন। তবে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ২৯ অক্টোবর এলপিজির দাম নির্ধারণে গণশুনানি করবে বিইআরসি।
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খান বলেন, বিইআরসির সঙ্গে বৈঠকে দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস পাওয়া গেছে। তারা দাবি বিবেচনায় নিয়ে ২৯ অক্টোবর গণশুনানি করবে। তাই এলপিজি বিক্রি বন্ধ রাখার কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধসহ কয়েকটি দাবিতে ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সারাদেশে এলপিজির দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয় এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। গত সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খান এ ঘোষণা দেন। তিনি জানান, দাবি পূরণ না হলে দুই দিনের কর্মসূচির পর আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। এলপিজি বিক্রি দুই দিন বন্ধের ঘোষণায় চাহিদা বেড়ে গেছে, তবে সরবরাহ কম
এ পরিস্থিতিতে দুই দিন ধরে এলপিজি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছে বিইআরসি। গতকালও বৈঠকে তাদের দাবি বিবেচনার প্রতিশ্রুতি দেয় কমিশন। তাদের দাবির মধ্যে অন্যতম হলো, প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারে পরিবেশকদের কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা করতে হবে। গণশুনানির মাধ্যমে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।
এর আগে গতকাল সকালে এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে সচিবালয়ে বৈঠক করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিয়ে বারবার দাম বাড়ানোর চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যবসায়ীদের আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে। বাজারে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করা হলে সরকার আইনগত ব্যবস্থা নেবে। একই সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, এলপিজির সরবরাহ ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করছে সরকার। তবে দাবি আদায়ে ধর্মঘটের মাধ্যমে বাজারে অস্থিরতা তৈরি করা হলে তা বরদাশত করা হবে না।
ব্রিফিংকালে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে পৃথিবীর সব জায়গায় জ্বালানি সংকট চলছে এবং এর মূল্য ওঠানামা করছে। জ্বালানির উৎসও খুব সীমিত হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিইআরসিকে ভোক্তাদের জন্য সহনীয় পর্যায়ে এলপিজি মূল্য রাখার বিষয়ে আলোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কথায় কথায় ধর্মঘট করে জিনিসের মূল্য বাড়ানো গ্রহণ করা হবে না। আমরা নির্বাচিত সরকার, জনগণের আস্থা নিয়ে সরকারে এসেছি। জনগণ যাতে কোনো অসুবিধায় না পড়ে, সেটি দেখা আমাদের দায়িত্ব। যারা ধর্মঘট দিচ্ছেন, তারা যেন আলোচনার টেবিলে এসে সমস্যার সমাধান করেন।
মন্ত্রী আরও জানান, ইতোমধ্যে অপারেটরদের সঙ্গে তিনবার বসে বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হয়েছে। তাদের সমস্যাগুলো কীভাবে সমাধান করা যায়, তা নিয়ে আজকেও আলোচনা হয়েছে। আগামী ৩০ অক্টোবর আবারও অপারেটরদের সঙ্গে বসে বাজার স্থিতিশীল রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা : সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, এলপিজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরবরাহ ও বিপণনব্যবস্থায় কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা কিংবা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া হবে না। তিনি মনে করিয়ে দেন, দেশে ‘এসেনশিয়াল কমোডিটিস অ্যাক্ট, ১৯৫৬’ বলবৎ রয়েছে। জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়, এমন কোনো কর্মকাণ্ড সরকার বরদাশত করবে না।
মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান, বিইআরসি সচিব, প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক, এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলওএবি) মহাসচিবসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় এলপিজি কোম্পানি যেমন— বসুন্ধরা এলপি গ্যাস, বেক্সিমকো, ওমেরা, যমুনা ও এলপি গ্যাস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন।
