সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দিয়ে এলপিজি কিনতে হচ্ছে গ্রাহকদের। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের সরকারি দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়।
- আরও ১০০ টাকা অতিরিক্ত কমিশন চায় ব্যবসায়ী সমিতি
- ব্যবসায়ীদের সাংবাদিক সম্মেলন আজ
সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দিয়ে এলপিজি কিনতে হচ্ছে গ্রাহকদের। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের সরকারি দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। সরবরাহ সংকটের কথা বলে বিভিন্ন পর্যায়ে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অথচ গত মাসে দেড় লাখ টনের বেশি এলপিজি আমদানি হয়েছে, যা আগের কয়েক মাসের তুলনায় বেশি। আমদানি বাড়ার পরও বাজারে সরবরাহের ঘাটতি কেন, আর নির্ধারিত দামের বাইরে নেওয়া অতিরিক্ত অর্থের বড় অংশ কার পকেটে যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এলপিজির বাজার তদারকি করতে গতকাল রবিবার সকালে জরুরি বৈঠক করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, রবিবার তারা এ বিষয়ে বৈঠকে করেছেন। সেখান থেকে সরাসরি আমদানিকারকদের সঙ্গে কথা বলেন। সমস্যা কোথায় তৈরি হচ্ছে, তা দেখা হচ্ছে ।
অন্যদিকে, এলপিজি ব্যবসায়ী মালিক সমিতি লিমিটেড নামে ব্যবসায়ীদের একটি সংগঠন আজ সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাদের কমিশন আরও বাড়াতে হবে। সাংবাদিক সম্মেলনে বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে আরও ১০০ টাকা অতিরিক্ত কমিশন দাবি করবে এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতি।
বাজার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বড় কোম্পানি থেকে ডিলার, এরপর খুচরা ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে গ্রাহকের কাছে পৌঁছাচ্ছে এলপিজি। সরবরাহ সংকটের কথা বলে ডিলাররা খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীরাও নিজেদের মুনাফা যোগ করে তা বিক্রি করছেন। ফলে নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিয়েও সিলিন্ডার পেতে ভোগান্তিতে পড়ছেন গ্রাহকরা।
গত ৪ অক্টোবর এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। এতদিন এই সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। সে হিসাবে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ২৫২ টাকা। আগেও সরকারের নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি হতো না। এখন দাম বাড়ানোর পরও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এলপিজির বাড়তি দাম চাওয়া হচ্ছে। কোথাও ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৩০০ টাকা, কোথাও আবার সিলিন্ডার নেই বলে জানাচ্ছেন বিক্রেতারা।
কাঠালবাগানের খুচরা ব্যবসায়ী জাকির হোসেন জানান, এখন সিলিন্ডার নেই। রাতে সিলিন্ডার আসতে পারে, তবে দাম দিতে হবে ২ হাজার ৩০০ টাকা। দাম বেশি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাজারে নাই। আমাকেও বেশি দামে কিনে আনতে হচ্ছে। আমি কি বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করবো? তাতে আমার ব্যবসা চলবে কীভাবে? বাজারে নাই। আপনি অন্য জায়গায় কমে পেলে নিতে পারেন। আমার লোকের অভাব নাই। অনেকেই এসে এসে ঘুরে যাচ্ছেন।’
পশ্চিম ধানমন্ডির ‘সোনালী এন্টারপ্রাইজ’ নামে এক দোকানের কর্মী বলেন, ডিলারদের কাছে যে পরিমাণ চাইতেছি তা তারা দিতে পারছে না। বলতেছে, তার কাছেও পরিমানে কম আছে। ফলে তারাও দাম কিছুটা বাড়িয়ে বলতেছে। মালিকদের তো ব্যবসা চালাতে হবে। তাই তাদের কথায় রাজি হয়ে যে কয়টা পারে সে অনুযায়ি নিয়ে নিতেছে সিলিন্ডার। উপায় তো নাই আমাদেরও। এদিকে যারা নিয়মিত নেয় তাদেরও গ্যাস শেষ তারাও বেশি দাম হলেও নিতে চাইতেছে। তাই মালিককেও বেশি দাম দিয়েই আনতে হচ্ছে।
এলপিজির বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে ২০ সেপ্টেম্বরের পর থেকে। বিইআরসি সূত্রে জানা গেছে, ওই সময়ের পর থেকে আমদানিকারকরা বাজারে সরবরাহ কমিয়েছেন। কমিশনের কাছে ১১টি কোম্পানি বিক্রির তথ্য দিয়েছে। সেসব তথ্য অনুযায়ী, মাসের শুরুতে বিক্রি বেশি থাকলেও শেষের দিকে এসে তা কমেছে। কোনো কোনো কোম্পানি মাসের শেষ দিকে বিক্রি বন্ধও রেখেছে বলে অভিযোগ আছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অক্টোবরের শুরুতে দাম বাড়তে পারে, এমন ধারণা থেকে চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি বাজারে ছাড়েননি কোনো কোনো অপারেটর। সরবরাহ কমে যাওয়ায় ডিলার ও খুচরা পর্যায়ে সংকটের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই সুযোগে বিভিন্ন পর্যায়ে বাড়তি দাম নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, সরকারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে দেড় লাখ টনের বেশি এলপিজি আমদানি হয়েছে। এর আগের কয়েক মাসে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টন। আমদানি বাড়লেও বাজারে সরবরাহের ঘাটতি কেন, আর নির্ধারিত দামের বাইরে অতিরিক্ত অর্থই বা কারা নিচ্ছে, এ প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব মিলছে না।
তবে আমদানিকারকদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, জাহাজভাড়া ও আমদানির প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ায় এলপিজি আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। বেসরকারি অপারেটর টিএমএসএস এলপিজির এজিএম আনিসুর রহমান বলেন, ঠিক সময়ে চালান আসা নিশ্চিত না হওয়ায় অনেক কোম্পানি বাধ্য হয়ে রেশনিং করছে। তবে বাজারে একেবারে গ্যাস নেই, এমন ধারণা ঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাজারে সংকট দেখা দেওয়ার পর গত ২৮ সেপ্টেম্বর জ্বালানিমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে বাজারে সংকট নেই বলে জানানো হয়। এরপরও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় ২৯ সেপ্টেম্বর এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) বিবৃতি দিয়ে বিইআরসি নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রির নির্দেশনা দেয়। পরে জ্বালানিমন্ত্রী জেলা প্রশাসকদেরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন।
কিন্তু নির্দেশনা ও সরকারি পদক্ষেপের পরও বাজারে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। আমদানি, সরবরাহ ও বিক্রির প্রতিটি পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি ছাড়া এই বাড়তি অর্থের সুবিধাভোগী কারা, তা শনাক্ত করা এবং বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
