ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে সে দেশে চলমান আন্দোলন এক উত্তাল রূপ নিয়েছে। রাজধানী দিল্লিসহ দেশটির বড় বড় শহরের রাজপথ এখন ‘মোদি হটাও, ভারত বাঁচাও’ স্লোগানে প্রকম্পিত। স্লোগান উঠেছে, ‘ভোট চোর, গদি ছোড়’, ‘জ্ঞানেশ, ইটস ডান ব্রো’, ‘শেম, শেম দিল্লি পুলিশ’ এবং ‘মোদি, গদি ছোড়ো, কিংবা ‘নেক্সটআপ, মোদিস টার্ন’। এসব স্লোগান এখন সবার দৃষ্টি কাড়ছে।
ভোটার তালিকা থেকে কোটি কোটি নাম বাদ দেওয়া এবং শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয়করণের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন শুরু হয়েছে। মোদি সরকারের দমনের মুখে আন্দোলন আরো বেগবান হয়ে উঠছে এবং এই আন্দোলন এক দফায় রূপ নিয়ে ক্ষমতার মূল কেন্দ্র দিল্লি কাঁপিয়ে তুলছে।
বিজ্ঞাপন
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার ১২ বছরেরও বেশি সময়ের শাসনকালে এর আগে এমন আন্দোলনের মুখে পড়েননি। বর্তমানে তিনি সবচেয়ে বড় এবং নজিরবিহীন রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করছেন। দিল্লির রাজপথে ‘জেন-জি’ ও ককরোচ জনতা পার্টির মতো ছাত্র-যুব আন্দোলনকারী এবং কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, বামপন্থী দলগুলোসহ ২৫টি দলের ইন্ডিয়া জোট ঐক্যবদ্ধভাবে এই আন্দোলন গড়ে তুলেছে। তারা একযোগে ‘সেভ ডেমোক্রেসি’ (গণতন্ত্র বাঁচাও) সমাবেশের মাধ্যমে এই যৌথ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গে, মমতা ব্যানার্জি, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব, শারদ পাওয়ার এবং বামপন্থী নেতারা আন্দোলনে ছাত্র-তরুণদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
বুকার পুরস্কার পাওয়া প্রখ্যাত লেখক অরুন্ধতী রায়ের ভাষায়, ককরোচরা মোদির ‘তিলে তিলে’ গড়া ভাবমূর্তি চুরমার করে দিয়েছে। তারা মোদি সরকারের একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
মোদি বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
আগেই বলেছি, আন্দোলনটি এখন শুধু সাধারণ বিক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি কার্যত সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে। রাজধানী নয়াদিল্লি আন্দোলনের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া মুম্বাই, কলকাতা, চেন্নাইসহ ভারতের বড় বড় শহর ও বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রগুলোতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। তীব্র আন্দোলনের মুখে সরকার নয়াদিল্লির বিভিন্ন মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দিয়েছে এবং নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় ও দমন-পীড়ন চালাচ্ছে। আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলো মূলত ভোটাধিকার এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার সঙ্গে জড়িত। ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিই এখন আন্দোলনের প্রধানতম দাবি। কারণ বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, প্রধান নির্বাচন কমিশনার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (SIR) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দিয়েছেন, যা মূলত ক্ষমতাসীন বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক অপকৌশল।
গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে ফাঁস হয় যে, নির্বাচন কমিশনের দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের বিভিন্ন একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গত ১০ মাসে অন্তত ১৪টি লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন। কিন্তু জ্ঞানেশ কুমার তাদের মতামতকে উপেক্ষা করে প্রায় ১৩ কোটি ভোটার বাদ দেওয়ার আদেশ জারি করেছেন।
জ্ঞানেশ কুমারের অধীনে ইসিআই-নেট (ECINET) নামক কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার চালু করা হয়। এই সফটওয়্যারে সুবিধা বা ম্যানিপুলেশনের কারণে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাচ্ছে। যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ পড়ে যাচ্ছে গোয়া ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে। এই সফটওয়্যারের কারণে ভোটার তালিকায় ব্যাপক অসঙ্গতি দেখা দেয়।
এছাড়াও নরেন্দ্র মোদি সরকারের শিক্ষা পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষা ব্যবস্থার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করছেন ছাত্ররা। এছাড়া গণতন্ত্র ধ্বংস, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের অভাব এবং তরুণদের কণ্ঠরোধ করার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতের দাবি জানানো হচ্ছে।
এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হলো ভারতের ছাত্রসমাজ এবং তরুণ প্রজন্ম। বিশেষ করে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো এবং কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন এনএসইউআই (NSUI) রাস্তায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ২০২৬ সালের জুন মাস থেকে ছাত্ররা আন্দোলন করছে। মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা (এনইইটি)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সিবিএসই-এর অন-স্ক্রিন মার্কিং প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের একটি বড় বিশেষত্ব হলো, এটি কোনো একক রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে না। একে তরুণদের একটি স্বতঃস্ফূর্ত ‘ককরোচ’ (Cockroach) আন্দোলন বা জনসাধারণের গণআন্দোলন বলা হচ্ছে। তবে ছাত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের ক্র্যাকডাউনে আহতদের পাশে দাঁড়িয়ে এবং রাস্তায় সংহতি প্রকাশ করে এই মুহূর্তে তরুণদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর ও নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন লোকসভার প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী।
চারদিক থেকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নতুন দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘ব্লুমবার্গ নিউ ইকোনমি ফোরামে’ দাবি করেছেন যে, ‘ভারত হলো গণতন্ত্রের জননী’। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্দোলনকারীরা মোদির এই বক্তব্যকে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে চরম অসঙ্গতিপূর্ণ এবং উপহাস হিসেবে মন্তব্য করেছেন।
রাতের রাজপথে ‘জেন-জি’ ও বিরোধীদের মহাবিদ্রোহ
দীর্ঘ ৭৬ বছর ধরে ভারত বিশ্বমঞ্চে বুক ফুলিয়ে পরিচয় দিয়ে এসেছে—তাদের আছে ‘বিশ্বের বৃহত্তম সচল গণতন্ত্র’। নিয়মিত নির্বাচন, ব্যালট বিপ্লব আর শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের উদাহরণ দেখিয়ে ভারতীয়রা এতদিন যে গর্ব করত, ২০২৬ সালের অক্টোবরের এই উত্তাল দিনগুলোতে এসে সেই গর্ব যেন তাসের ঘরের মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি সংবিধান কার্যকর করার মাধ্যমে ভারতের গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হয়।
নব্বইয়ের দশকে টি এন সেশনের মতো আপসহীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের (ECI) ভিত গড়ে তুলেছিলেন, আজ ভারতে তা সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত। সেশনের মূল শক্তি ছিল তৃণমূল পর্যায়ের স্বচ্ছতা। কিন্তু আধুনিকায়নের নামে তথ্যের কেন্দ্রীয়করণ ও বিতর্কিত সফটওয়্যার ‘ইসিআই-নেট’ (ECINET)-এর মারপ্যাঁচে সেই সুরক্ষাকবচ আজ হাওয়া করে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ভেতরকার নজিরবিহীন এই একনায়কত্ব আজ ফাঁস হয়ে গেছে নরেন্দ্র মোদির নিয়োগ করা বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডে।
ভারতীয় ইতিহাসের বৃহত্তম ‘ভোট চুরি’
যে ভোটাধিকারকে ভারতীয় নাগরিকরা পবিত্র মনে করত, তাতে লেগেছে সবচেয়ে বড় ধাক্কা। নির্বাচন কমিশনের ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (SIR) প্রক্রিয়ার আড়ালে ভারতজুড়ে প্রায় ১৩ কোটি (১৩০ মিলিয়ন) ভোটারের নাম তালিকা থেকে এক ঝটকায় বাদ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু মুসলমান, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং বিরোধীদলীয় সমর্থকদের বেছে বেছে তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। একে ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ‘পদ্ধতিগত ভোট চুরি’ বলে আখ্যা দিয়েছে বিরোধী দলগুলো। যে দেশে কোটি কোটি মানুষের নিজের দেশের ভোটার তালিকায় নাম নেই, সেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কীভাবে নিজেদের ‘গণতন্ত্রের জননী’ বলে দাবি করেন—আজ এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
রাজপথে ‘জেন-জি’ ও বাংলাদেশের ‘জুলাই বিপ্লবের’ ছায়া
সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে ভারতের তরুণ প্রজন্ম। NEET পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, CBSE-র মার্কিং কেলেঙ্কারি আর তীব্র বেকারত্বে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া তরুণরা ব্যঙ্গাত্মকভাবে গড়ে তুলেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)। দিল্লির ঐতিহাসিক ‘যন্তর মন্তর’ আজ পুলিশি ব্যারিকেডে অবরুদ্ধ, সেন্ট্রাল দিল্লিতে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ, আর মাত্র কয়েকদিনেই বিরোধী নেতা ও ছাত্রসহ প্রায় ৭,০০০ মানুষকে গণ-গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এই দমন-পীড়ন ভারতীয়দের মনে করিয়ে দিচ্ছে ২০২৪ সালের বাংলাদেশের ‘জুলাই আন্দোলন’-এর কথা। মুম্বাই ও দিল্লির রাস্তায় যখন ভারতীয় ছাত্রীরা পুলিশের সাঁজোয়া যানের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াচ্ছে, তখন বিশ্ববাসী দেখছে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের হুবহু এক প্রতিচ্ছবি। ভারতের ছাত্রনেতারাও আজ বুক ফুলিয়ে বলছেন—বাংলাদেশের তরুণরাই তাদের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার পথ দেখিয়েছে।
রাজপথে সম্মিলিত স্লোগান ও মোদির ওপর নজিরবিহীন চাপ
এতদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে যে অপরাজেয় ও লৌহমানব মনে করা হতো, ১২ বছরের শাসনামলে তিনি আজ সবচেয়ে তীব্র রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপে। রাহুল গান্ধী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদবদের নিয়ে গঠিত বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোট আজ সুসংগঠিত। সুপ্রিম কোর্টে যৌথ মামলার পাশাপাশি গত ১২ অক্টোবর দিল্লির বুকে তারা নামিয়েছে হাজার হাজার মানুষের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’।
দিল্লির বাতাস আজ আর প্রথাগত স্লোগানে ভারী হচ্ছে না, বরং তরুণদের মুখে মুখে ফিরছে ব্যঙ্গাত্মক ও ঝাঁঝালো স্লোগান : ‘জ্ঞানেশ, ইটস ডান ব্রো!’ (জ্ঞানেশ, তোমার সময় শেষ, এবার পদত্যাগ করো’) কিংবা ‘ভোট চোর, গদি ছোড়!’। বলিউডের ‘গলিবয়’ সিনেমার জনপ্রিয় হিপ-হপ ‘আজাদি’ গান আজ ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি তরুণের কণ্ঠে প্রতিবাদের ভাষা। এটা যেন আন্দোলনের ‘থিম সং’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যে ভারতীয়রা বিশ্বজুড়ে গর্ব করত তাদের শক্তিশালী বিচার বিভাগ, মুক্ত গণমাধ্যম আর স্বাধীন নির্বাচন কমিশন নিয়ে—আজ আন্তর্জাতিক সূচকে তাদের অবস্থান ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র’ কিংবা ‘নির্বাচনি স্বৈরতন্ত্রের’ তালিকায়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আজ ১৫৭তম স্থানে গিয়ে ঠেকেছে।
ভারতের এই সর্বশেষ পরিস্থিতি বিশ্বকে এক নির্মম বার্তা দিচ্ছে : গণতন্ত্র কেবল ভোট উৎসবের নাম নয়। যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো মেরুদণ্ড হারায় এবং কোটি কোটি নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, তখন ৭৬ বছরের পুরোনো অহংকারও রাজপথের ধুলোয় মিশে যেতে সময় লাগে না। ভারতের সাধারণ মানুষ ও জেন-জি তরুণরা আজ সেই চূর্ণ-বিচূর্ণ অহংকার জোড়া লাগানোর জন্যই নিজেদের বুক চিতিয়ে দিয়েছে দিল্লির রাজপথে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক
