বাইরে জমকালো সাইনবোর্ডে লেখা ‘২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল’। কিন্তু ভেতরের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ উল্টো। কাগজে-কলমে ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালটি বাস্তবে ধুঁকছে মাত্র ৫০ শয্যার জনবল নিয়ে। পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও অবকাঠামোর চরম সংকটে দ্বীপ জেলা ভোলার ২২ লাখ মানুষের একমাত্র ভরসাস্থল ভোলা সদর হাসপাতালটি নিজেই যেন আজ মারাত্মক ‘রোগী’তে পরিণত হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে মোট ৮৬ জন চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে। তবে কাগজে-কলমে পদায়ন রয়েছে মাত্র ২১ জনের। তার ওপর দুজন রয়েছেন দীর্ঘমেয়াদি অর্জিত ছুটিতে এবং আরও একজন নিয়োজিত আছেন প্রশাসনিক দায়িত্বে। ফলে মাত্র ১৭ জন চিকিৎসকের কাঁধে চেপেছে পুরো জেলার প্রতিদিনের হাজার হাজার রোগীর চিকিৎসার ভার!
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজারেরও বেশি রোগী ভোলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। যেখানে অনুমোদিত চিকিৎসক পদের পাঁচ ভাগের এক ভাগও পূরণ নেই, সেখানে সঠিক ও মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়া ভোলার মানুষের জন্য এখন এক অলীক স্বপ্ন।
করোনাকালে মুমূর্ষু রোগীদের বাঁচানোর তাগিদে কোটি টাকা ব্যয়ে ভোলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা হয়েছিল। তবে উদ্বোধনের এত দিন পরও দক্ষ জনবল ও চিকিৎসকের অভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি অত্যন্ত জরুরি এই সেবাকেন্দ্র। অব্যবস্থাপনা ও অযত্নে পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে কোটি টাকার আধুনিক সরঞ্জাম। অথচ আইসিইউ সেবার অভাবে প্রতিনিয়ত রোগীদের ছুটতে হচ্ছে বরিশাল বা ঢাকায়।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দুপুরে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে সরেজমিনে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ধারণক্ষমতার চার গুণ বেশি শিশু ভর্তি রয়েছে এখানে। তাদের মধ্যে হামের মতো তীব্র সংক্রামক রোগে আক্রান্ত শিশুরাও রয়েছে। গাদাগাদি করে থাকা এসব শিশুর স্বাস্থ্যসেবায় পুরো ওয়ার্ডে নিয়োজিত আছেন মাত্র একজন চিকিৎসক। একাই এত রোগী সামলাতে গিয়ে তিনি রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ভুক্তভোগীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ভোলার মানুষের জন্য নতুন ক্যাবিনেট বা মেডিকেল কলেজ যখন হওয়ার হবে, তা পরে দেখা যাবে। সরকারের কাছে তাঁদের এই মুহূর্তের প্রধান দাবি—বর্তমান ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল দ্রুত পদায়ন করা হোক।
চিকিৎসকসংকট ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি সম্পর্কে চিকিৎসক ডা. শুভ প্রসাদসহ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক জানান, ভোলাবাসী মেডিকেল কলেজের দাবিতে সোচ্চার হলেও হাসপাতালে চিকিৎসকদের শূন্যপদ পূরণের বিষয়ে ততটা সোচ্চার নন। পাশাপাশি, এখানে নতুন যারা পদায়ন পান, দীর্ঘমেয়াদি নীতির অভাবে তারাও অল্প দিনের মধ্যে বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান।
অন্যদিকে, চিকিৎসকসংকট ও ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ভোলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. তৈয়বুর রহমান জানান, শূন্যপদ পূরণ ও প্রয়োজনীয় জনবল পদায়নের জন্য তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়মিত চিঠি পাঠাচ্ছেন এবং বিষয়টি সম্পর্কে সার্বক্ষণিকভাবে অবহিত রাখছেন।
দ্বীপের ২২ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং অকালমৃত্যু প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে ভোলা সদর হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক পদায়ন ও বন্ধ থাকা আইসিইউ ইউনিট দ্রুত চালুর জোরালো দাবি জানিয়েছেন ভোলার সচেতন নাগরিক সমাজ।
