নদীর পানিতে ভাসছে বস্তাবন্দি মরা মুরগি। কোথাও জমে আছে মুরগির বিষ্ঠা ও অন্যান্য বর্জ্য। পচা মুরগির উৎকট দুর্গন্ধে নদীর দুই পাড়ের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়েও দুর্গন্ধ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না মুসল্লিরা। শুধু পরিবেশদূষণই নয়, বর্জ্য জমে ব্যাহত হচ্ছে পানি নিষ্কাশনও। এতে জলাবদ্ধ বিলডাকাতিয়ার পানি নামতে বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
এ চিত্র ডুমুরিয়া ও বটিয়াঘাটা উপজেলার সীমান্তবর্তী কৈয়া নদীর শৈলমারী ১০ ভেন্ট রেগুলেটরসংলগ্ন এলাকার। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর দুই পাড়ে অবস্থিত কয়েকটি লেয়ার মুরগির খামার থেকে মরা মুরগি ও বিষ্ঠা ফেলার কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে একটি খামার কর্তৃপক্ষ মুরগির বিষ্ঠা নদীতে ফেলার কথা স্বীকার করলেও মরা মুরগি ফেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
শুক্রবার সকালে শৈলমারী ১০ ভেন্ট রেগুলেটরের সামনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর পানিতে অসংখ্য বস্তাবন্দি বস্তু ভাসছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব বস্তায় রয়েছে মরা মুরগি। দীর্ঘ সময় পানিতে পড়ে থাকায় সেগুলো পচে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। নদীর আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে সেই দুর্গন্ধ। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সেখানে বসবাস করা থেকে শুরু করে ধর্মীয় উপাসনালয়ে যাতায়াতেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে মানুষকে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নদীর দুই পাড়ে রয়েছে এম্পেরিয়াল-৬, আরআরবি এগ্রিকালচারাল ফার্ম এবং মনির হোসেনের মালিকানাধীন একটি লেয়ার মুরগির খামার। এলাকাবাসীর অভিযোগ, খামারগুলোতে বিভিন্ন সময়ে মারা যাওয়া মুরগি বস্তায় ভরে রাতের আঁধারে নদীতে ফেলা হয়। মুরগির বিষ্ঠাও সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি বর্জ্য জমে পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে।
দুর্গন্ধে মসজিদে নামাজ পড়াও দায়
শৈলমারী আলেকজাম জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, “প্রচণ্ড দুর্গন্ধে এলাকায় বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মসজিদটি নদীর একেবারে কাছাকাছি হওয়ায় পচা মুরগির গন্ধে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে। এ বিষয়ে আগেও কয়েকবার খামার কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি।”
স্থানীয় বাসিন্দা সুরোজ শেখের অভিযোগ, এম্পেরিয়াল-৬ খামার থেকে নিয়মিত মরা মুরগি নদীতে ফেলা হচ্ছে। পাশাপাশি সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে মুরগির বিষ্ঠা। এতে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে এবং পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে এম্পেরিয়াল-৬ খামারের মোহাম্মদ টিপু হোসেন বলেন, “নদীতে মুরগির বিষ্ঠা ফেলার বিষয়টি স্বীকার করছি। তবে মরা মুরগি ফেলার অভিযোগ সঠিক নয়। নদীতে বিষ্ঠা ফেললে যদি ক্ষতি হয়, তাহলে ফেলতে নিষেধ করে দেব।”
বর্জ্যে আটকে যাচ্ছে পানি নিষ্কাশন
নদীদূষণের পাশাপাশি শৈলমারী রেগুলেটরের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। রেগুলেটরের দায়িত্বে থাকা সাকিল নামে এক কর্মী জানান, “নদীর বর্জ্য পাম্পের সামনে এসে জমা হচ্ছে। এতে পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। মাঝেমধ্যে পাম্প বন্ধও হয়ে যাচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক গতিতে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে।”
স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে বর্জ্য জমতে থাকলে বিলডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতা নিরসন বাধাগ্রস্ত হবে। বর্ষা-পরবর্তী সময়ে কৃষিজমি ও নিম্নাঞ্চলের পানি দ্রুত সরানো না গেলে কৃষি উৎপাদন ও জনজীবনে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
শৈলমারী রেগুলেটরের মুখে খননকাজে নিয়োজিত পানি উন্নয়ন বোর্ডের যান্ত্রিক বিভাগের এসডি আব্দুল হাই বলেন, “পচা বর্জ্যের তীব্র দুর্গন্ধে খননকাজে নিয়োজিত কর্মীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এভাবে নদীতে বর্জ্য ফেলার কারণে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।”
আইনগত ব্যবস্থার আশ্বাস প্রশাসনের
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার বলেন, “নদীতে মরা মুরগি ও বর্জ্য ফেলে পানি দূষিত করা বড় অপরাধ। এ ঘটনায় যে-ই জড়িত থাকুক, তার বিরুদ্ধে অচিরেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, নদীতে বর্জ্য ফেলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে নদীতে ভাসমান বস্তাবন্দি মরা মুরগি ও জমে থাকা বর্জ্য অপসারণ, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সচল এবং ভবিষ্যতে নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
