এবি পার্টির মুক্ত আলোচনা সভায় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান
আগের স্বৈরাচার যে পথে হেঁটেছিল, বর্তমান সরকারও হুবহু সেই পথেই হাঁটছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এমপি।
- জাতিকে বিভক্ত করে লাভ হবে না -কর্নেল অলি
- জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ঐক্যকে রাজনৈতিক স্বার্থে বিভক্ত করা উচিত নয়- মামুনুল হক
আগের স্বৈরাচার যে পথে হেঁটেছিল, বর্তমান সরকারও হুবহু সেই পথেই হাঁটছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এমপি। তিনি বলেছেন, সাত মাসেই রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে। প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে হাত দেওয়া হচ্ছে। বিএনপি জনগণকে মূর্খ মনে করে এবং অবমূল্যায়ন করে। তারা নিজেদেরই শুধু জ্ঞানী মনে করে।
গতকাল রোববার বেলা ১১টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) উদ্যোগে ‘জুলাই সনদের ১ বছর: প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার সালতামামি’ শীর্ষক মুক্ত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
পিএসসির বিষয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছিল মেধার অধিকার আদায়ের জন্য। মেধার ভিত্তিতে প্রত্যেকে যেন নিজের যোগ্য স্থান নিশ্চিত করতে পারে, সেই দাবিতে তারা আন্দোলন করেছে। তারা রাষ্ট্রকে সেবা দিতে চায়। আর এই সুযোগ তৈরি হয় পিএসসির মাধ্যমে। একের পর এক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার পর এখন তারা পিএসসিতে হাত দিয়েছে। রাজনৈতিক সরকারের প্রভাব খাটিয়ে পিএসসির সদস্যদের পদত্যাগ করতে বলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, পিএসসি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এটি কোনো মন্ত্রীর পারিবারিক ব্যবসা নয়। কোনো মন্ত্রীর এ কথা বলার অধিকার নেই। চাকরির এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে পরিপূর্ণ করতে চায় সরকার।
সরকারি বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তারা বলছে, যে এলাকার মানুষ তাদের ভোট দেয় নি বা দেবে না, সে এলাকায় কোনো বরাদ্দ দেওয়া হবে না। বর্তমান রাষ্ট্রপতিও রংপুরে একই কথা বলে এসেছেন। যে আবু সাঈদ বৈষম্যের বিরুদ্ধে বুক পেতে জীবন দিয়েছেন, তার এলাকায় গিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ‘ভোট দেবেন জামায়াতকে, জাতীয় পার্টিকে, আর উন্নয়ন চাইবেন বিএনপির কাছে এটা কি বিএনপির বাবার তহবিল থেকে উন্নয়ন হবে?’
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা হওয়া করের টাকায় শিশু থেকে শুরু করে সব পেশা ও শ্রেণির মানুষের অবদান রয়েছে। কেউ প্রত্যক্ষ কর দেন, কেউ পরোক্ষ কর দেন। এটি একটি কমিউনিটি ফাণ্ড। গরিবের টাকা আলাদা করে রাখা হয় না। সব টাকা এক জায়গায় জমা হয়। সুতরাং এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া শুধু অশালীনতা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় অপরাধ।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকারি দলের ২০০ জন সংসদ সদস্যের আসনে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, অথচ বিরোধী দলের একজন সংসদ সদস্যকেও সেই বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এই বৈষম্যের জন্যই কি এতগুলো জীবন গেল? এ জন্যই কি আমাদের চব্বিশের জুলাই বিপ্লব হয়েছিল? জুলাই বিপ্লব হয়েছিল পরিবর্তনের জন্য, বস্তাপচা রাজনীতির কবর রচনা করে নতুন রাজনীতির সূচনা করার জন্য। জনগণ এমনটাই আশা করেছিল। কিন্তু আবারও দেশটাকে সেই দিকেই টেনে নেওয়া হলো।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বিরোধী দল কি গালে আঙুল দিয়ে বসে থাকবে? শত ইঞ্জিনিয়ারিং ও চুরি-চামারির পরও জনগণ আমাদের যে কয়টি আসন দিয়েছে, সেই আসনগুলোর ৮৯ জন সংসদ সদস্য সারা দেশের ১৮ কোটি মানুষের পাহারাদার হিসেবে কাজ করবেন, ইনশাআল্লাহ।
তিনি বলেন, বিএনপি বদলে গেলেও আমরা আমাদের কথা বদলাব না। জুলাই সনদ ও গণভোটের গণরায় আমরা আদায় করেই ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ। আমাদের বণ্ড লোভ দেখানো হয়েছে, কিন্তু আমরা সেগুলোর দিকে তাকাই নি; প্রত্যাখ্যান করেছি। যার ইচ্ছা, সে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করুক। কিন্তু হিমালয় পর্বতের মতো অটল থেকে লক্ষ্যপানে এগিয়ে যাবে বিরোধী দল।
নিজেদের আন্দোলনের লক্ষ্য তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই আন্দোলন কোনো দলের জন্য নয়; প্রতিটি দাবি জনগণের জন্য। জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা, ফ্যাসিবাদের পথ বন্ধ করা, বৈষম্যহীন সমাজকাঠামো গড়ে তোলা এবং মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য এ আন্দোলন। সন্তানদের ভবিষ্যৎ মসৃণ ও বাসযোগ্য করাই তাদের লক্ষ্য। কোনো ধরনের চোখরাঙানিকে তারা পরোয়া করবেন না।
তিনি বলেন, আমরা দেশকে ভালোবাসি। জ্বালাও-পোড়াও আমাদের আন্দোলনের কর্মসূচি নয়। আমাদের সন্তানেরা চব্বিশে দেখিয়ে দিয়েছে, জ্বালাও-পোড়াও লাগে না। খালি হাতে ঈমানি বল ও দেশপ্রেম বুকে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেলেই ফ্যাসিবাদের পতন হয়। এটি আমাদের জন্য শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা। এ পথ ধরেই আমরা এগিয়ে যাব এবং নব্য ফ্যাসিবাদের পতন হবে, ইনশাআল্লাহ।
বিএনপির প্রতি সহযোগিতার মনোভাবের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা তাদের পতন চাই নি; তাদের সফলতা চেয়েছিলাম। কারণ, তাদের সফলতা মানে দেশের সফলতা। আমরা ঘোষণা দিচ্ছি, ১৮ কোটি মানুষকে সহযোগিতা করব। কিন্তু এই সরকার বিরোধী দলের সহযোগিতা নিতে ব্যর্থ। বিরোধী দলের সহযোগিতা নেওয়ার যোগ্যতা তাদের নেই।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তারা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দিলেও বাস্তবে সবার আগে বাংলাদেশ নয়; সবার আগে তারা নিজেরা, নিজেদের পরিবার, সন্তান, ভাগনে, ভাতিজা, শ্বশুর ও স্ত্রীকে রাখছে। আমরা সিণ্ডিকেটের হাতে প্রিয় বাংলাদেশকে তুলে দেব না। এ দিন শেষ। যুবকেরা জেগে উঠেছে। পূর্ণমুক্তি না আসা পর্যন্ত তারা ঘুমাবে না। আর আমরা যুবকদের সঙ্গে আরও শক্তিশালী হয়ে কাজ করব, ইনশাআল্লাহ।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, সরকার প্রধানকে চিন্তা করতে হবে দেশের জনগণ কী চায়, এটাই হলো সবচেয়ে প্রথম। আমি কী মনে করি, আমি কে এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না। আমাকে জনগণ কীভাবে দেখে, সেটাই হলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কর্নেল অলি আহমদ বলেন, জাতিকে বিভক্ত করে লাভ হবে না। আমরা চেয়েছি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে। অনেকে বলে, শফিকুর রহমান সাহেব তো সরকারের কাজ করতেছে। কারণ আমরা এখনো পর্যন্ত সরকারের ক্ষতি হয় বা সরকার গদিচ্যুত হয়, এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হই নি। আমরা শুধু জনমত গড়ে তুলছি এবং জনগণের যে দাবি-দাওয়া, সেটা যেন গ্রহণ হয়—এটাই চেষ্টা করে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, আমরা কী চেয়েছি? বাংলাদেশের জনগণ যেন সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারে, আগামী দিনে যেন রাজনৈতিক দলগুলি সুন্দরভাবে কাজ করে, নিজেদের মধ্যে বিভেদে জড়িয়ে না পড়ে। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে সবাই বসে সংস্কারের দাবিগুলি লিপিবদ্ধ করেছিল। প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার বলেছিল, এই দাবিগুলি অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে এবং তিনি এটাও বলেছেন, ‘যার কথার ঠিক নাই, তার ঈমান নাই।’ আমি এদিকে যেতে চাই না, কারণ আমার ছেলে-সমতুল্য। আমি অনুরোধ করব, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আমরা এখানে এসেছি মৃত্যুবরণ করার জন্য, এটা একটা ফেইজ অব লাইফ, এটা জীবনের একটা অধ্যায়।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনি বলবেন একটা, করবেন আরেকটা। যেমন আপনারা বললেন, আপনারা কার্ড বিতরণ করবেন, নির্বাচনের আগে কার্ড বিতরণ করবেন বললেন। এটা একধরনের জনগণকে ঘুষ দেওয়া, নির্বাচনকে প্রভাবিত করা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার মুখের মধ্যে কলা নিয়ে বসেছিল, কথা বলতে পারে নাই। তার উচিত ছিল এখানে আইন ভঙ্গ হয়েছে, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে কর্নেল অলি আহমদ বলেন, আপনি চারদিকে অদক্ষ লোক দ্বারা বেষ্টিত, অপরিপক্ক লোক দ্বারা বেষ্টিত। এটার কেরানি চাকরি তালাশ করতে হলে, আপনি বলেন যে তাকে ইন্টারমিডিয়েট পাস হইতে হবে। আর এমপি হওয়ার জন্য কোনো ক্লাস পাস করার দরকার নাই, গুণ্ডা হলেই হবে। আগে কোনো কেউ বলছিল যে, পাঁচটা হুণ্ডা, দশটা গুণ্ডা এইটা থাকলেই নির্বাচন ঠাণ্ডা। এখন এইদিকে যেয়েন না। দেশকে সঠিক পথে চলার জন্য সাহায্য করেন।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, জুলাই সনদ বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলিল। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল দল-মত, শ্রেণি ও পেশার বিভেদ অতিক্রম করে জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ। ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারি ব্যবস্থার অবসান এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যে আকাঙ্ক্ষা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে, জুলাই সনদ তার রাজনৈতিক প্রতিফলন।
জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অবস্থানের সমালোচনা করে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলোতে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। সনদে স্বাক্ষরের সময় সংযুক্ত ব্যাখ্যা ও ফুটনোটের মাধ্যমে এর বাস্তবায়ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ইশতেহারের ওপর নির্ভরশীল করায় সনদের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ ধরনের শর্ত রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে জনগণের অভিপ্রায়কে দুর্বল করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়ে মামুনুল হক বলেন, জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যকে রাজনৈতিক স্বার্থে বিভক্ত করা উচিত নয়। বিশেষ করে ইসলামপন্থীদের লক্ষ্য করে বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা জুলাইয়ের ঐক্য ও আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী। আধিপত্যবাদবিরোধী সংগ্রাম এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, সালাহউদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রীকে যেভাবে ‘ফিটনেসবিহীন গাড়িতে’ তুলে দিয়েছেন, তাতে প্রধানমন্ত্রী হয়তো আপাতত সন্তুষ্ট আছেন। তার ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রীকে হাসপাতাল পরিদর্শন, ময়লা পরিষ্কার এবং ফুটপাত পরিদর্শনের মতো কাজে যুক্ত হতে হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভারসাম্য নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর ব্যবসায়িক স্বার্থে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন এনসিপির এই নেতা। এ থেকে কারা লাভবান হচ্ছেন, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি সালাহউদ্দিন আহমদ ও মীর শাহে আলমের মতো ব্যবসায়ীদের নাম উল্লেখ করেন। তার দাবি, ৫ আগস্টের পর দেশে ফিরে কেউ কেউ প্রভাবশালী মন্ত্রীর ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছেন।
এবি পার্টির সভাপতি মুজিবুর রহমান মঞ্জুর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন এবি পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগরের বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ ।
