জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সমাবর্তনে ছয় বছর পর সব শ্রেণির ডিগ্রিধারীদের নিবন্ধন ফি ২ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করায় ক্ষোভ জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা; বেকার গ্র্যাজুয়েটদের আর্থিক চাপ ও সান্ধ্যকালীন প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীদের একই অনুষ্ঠানে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সমালোচনার জবাবে উপাচার্য অধ্যাপক রইছ উদ্দীন আয়োজনের ব্যয় বৃদ্ধিকে ফি বাড়ানোর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) দ্বিতীয় সমাবর্তনের নিবন্ধন ফি বাড়ানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। বেকার ও চাকরিপ্রত্যাশী অনেক গ্র্যাজুয়েটের জন্য বাড়তি এই ব্যয় সমাবর্তনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা করছেন শিক্ষার্থীরা।
আগামী ২০২৭ সালের ৩০ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ২০১৯ সালে প্রথম সমাবর্তনের ছয় বছর পর আয়োজিত হতে যাওয়া এই অনুষ্ঠানে সব শ্রেণির ডিগ্রিধারীদের নিবন্ধন ফি ২ হাজার টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।
নতুন নির্ধারিত ফি অনুযায়ী, স্নাতক ও বিবিএ ডিগ্রিধারীদের নিবন্ধন ফি ৩ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। স্নাতকোত্তর ও এমবিএ ডিগ্রিধারীদের দিতে হবে ৬ হাজার টাকা, যা আগে ছিল ৪ হাজার টাকা।
এমফিল ও পিএইচডি গবেষকদের নিবন্ধন ফি ৪ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে। অন্যদিকে,প্রফেশনাল ও সান্ধ্যকালীন স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামের অংশগ্রহণকারীদের ফি ৬ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নিবন্ধন ফির বাইরে সনদ সংগ্রহের জন্যও নির্ধারিত ৮০০ টাকা ফি দিতে হবে। স্নাতক ও বিবিএ ডিগ্রিধারীদের সনদের জন্য অতিরিক্ত ৫০০ টাকা দিতে হবে। ফলে সার্ভিস চার্জের আগেই তাঁদের মোট ব্যয় দাঁড়াবে ৫ হাজার ৫০০ টাকা। স্নাতকোত্তর ও এমবিএ ডিগ্রিধারীদের নিবন্ধন ও সনদ বাবদ মোট দিতে হবে ৬ হাজার ৫০০ টাকা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জারি করা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সমাবর্তনে অংশগ্রহণের জন্য অনলাইন নিবন্ধন শুরু হয়েছে ১৫ অক্টোবর। নিবন্ধন চলবে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত।
ফি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা একদিকে ফি বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, অন্যদিকে নিয়মিত ও সান্ধ্যকালীন প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীদের একই সমাবর্তনে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন।
২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী আসাদুল ইসলাম আসাদ ফেসবুকে এক পোস্টে প্রশ্ন তুলে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কি চায় না শিক্ষার্থীরা সমাবর্তনে অংশগ্রহণ করুক? ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার ৫০০ টাকা ফি নির্ধারণের ভিত্তি কী?”
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) এজিএস ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুদ রানা সমাবর্তনের এই আয়োজনকে ‘এলিট’ বা উচ্চবিত্তকেন্দ্রিক বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, নিয়মিত শিক্ষার্থীদের আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়েই এ আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আরেক গ্র্যাজুয়েট তৌহিদুল ইসলাম সিয়াম বলেন, উচ্চ নিবন্ধন ফি চাকরিপ্রত্যাশীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করবে। এ ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের ফি তুলনামূলক কম বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নিয়মিত ও সান্ধ্যকালীন প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীদের একই অনুষ্ঠানে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মাহতাব লিমন মনে করেন, সান্ধ্যকালীন প্রোগ্রামের গ্র্যাজুয়েটদের জন্য আলাদা সমাবর্তনের আয়োজন করা উচিত। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তি প্রশাসনের
শিক্ষার্থীদের সমালোচনার জবাবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক রইছ উদ্দীন বলেছেন, ছয় বছর আগের প্রথম সমাবর্তনের তুলনায় বর্তমানে সার্বিক আয়োজনের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তিনি বলেন, “অনেকে বলছেন, ফি বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু একটি সফল সমাবর্তন আয়োজন করতে হলে আমাদের ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হয়। গত সমাবর্তনের পর বিভিন্ন জিনিসের দাম বেড়েছে। তখন যে গাউন ও অন্যান্য পোশাক কেনা হয়েছিল, এখন সেগুলোর দামও বেড়েছে।”
গ্র্যাজুয়েটদের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপের বিষয়টি স্বীকার করে উপাচার্য বলেন, ফি কম রাখা গেলে ভালো হতো। তবে প্রশাসনিক ব্যয়ের কারণে এ ক্ষেত্রে খুব বেশি সুযোগ নেই। সমাবর্তনে অংশগ্রহণকারীদের একাডেমিক গাউন ও অন্যান্য পোশাক দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
সান্ধ্যকালীন প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে উপাচার্য বলেন, ২০১৯ সালের সমাবর্তনেও তাঁদের অংশগ্রহণ ছিল। ফলে আগে থেকে চলে আসা এই ব্যবস্থা থেকে সরে আসা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, “বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কাউন্সিল ও সিন্ডিকেট সদস্য, সব বিভাগের চেয়ারম্যান এবং সব অনুষদের ডিনদের উপস্থিতিতে সমাবর্তনের নির্বাহী কমিটি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
