ঢাকা: শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দঘন দিনগুলোর রেশ কাটতে না কাটতেই বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ঘরে ঘরে আজ বেজে উঠেছে উৎসবের নতুন ঘণ্টা। শারদীয় দুর্গোৎসবের ঠিক পরবর্তী প্রথম পূর্ণিমা তিথিতে আজ রোববার (২৫ অক্টোবর) উদযাপিত হচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ও বর্ণিল ধর্মীয় উৎসব লক্ষ্মীপূজা। আশ্বিন মাসের এই বিশেষ পূর্ণিমা তিথিটি ‘কোজাগরী পূর্ণিমা’ নামে সমধিক পরিচিত। শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ধনসম্পদ, আলো, জ্ঞান, সৌভাগ্য, উর্বরতা ও ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মীকে বরণ করে নিতে আজ ভক্তরা নানা আচার-অনুষ্ঠান ও উপবাসব্রতের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করছেন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাসে দেবী লক্ষ্মী কেবল ধনধান্যের প্রতীকই নন, বরং তিনি মানবজীবনের উন্নতি, দানশীলতা, সাহস, সৌন্দর্য ও আলোরও উৎস। পৌরাণিক আখ্যানে বর্ণিত আছে যে, ভগবান বিষ্ণু যখন রাম বা কৃষ্ণরূপে অবতার গ্রহণ করেছিলেন, তখন দেবী লক্ষ্মী সীতা ও রাধারূপে তাদের সঙ্গিনী হয়েছিলেন। আর এই দেবীর বাহন হিসেবে পূজিত হয় শান্ত প্রকৃতির প্যাঁচা। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে রাজা-মহারাজা, ব্যবসায়ী সমাজ এবং সাধারণ গৃহস্থ সবার ঘরেই আবহমানকাল ধরে দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা হয়ে আসছে। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা মতে, আজকের এই পবিত্র পূর্ণিমা তিথি শুরু হবে বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে এবং তা স্থায়ী হবে আগামীকাল সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকাল ৯টা ৪১ মিনিট পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যেই ভক্তরা ভক্তিভরে দেবীর পূজা অর্চণা সম্পন্ন করবেন।
কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো রাত্রি জাগরণ। ‘কোজাগরী’ শব্দটির অর্থ ‘কে জাগরী’ বা ‘কে জেগে আছো’। লোকবিশ্বাস ও শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী, এই পূর্ণিমা রাতে দেবী লক্ষ্মী মর্ত্যে নেমে আসেন এবং ঘরে ঘরে গিয়ে দেখতে থাকেন কে জেগে আছে। যে গৃহে আলো থাকে, দরজা খোলা থাকে এবং গৃহস্থরা ভক্তিভরে জেগে থেকে তার আরাধনা করেন, দেবী সেই গৃহে প্রবেশ করে ধনধান্যে ভাণ্ডার পূর্ণ করে দেন। পক্ষান্তরে, যে বাড়ির দরজা বন্ধ থাকে এবং গৃহস্থরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকেন, দেবী সেখান থেকে নীরবে ফিরে যান। এই বিশ্বাসের বশবর্তী হয়েই সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী ও ভক্তরা আজ সারাদিন উপবাসব্রত পালন এবং রাতে ঘুমহীন জাগ্রত থেকে বিশেষ পূজা সম্পন্ন করেন।
বাঙালি সংস্কৃতিতে লক্ষ্মীপূজা এক নান্দনিক ও স্নিগ্ধ রূপ নিয়ে উপস্থিত হয়। পূজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গগুলোর মধ্যে রয়েছে পবিত্র সিঁদুর, মঙ্গলঘট, ধান, মাটি, আম্রপল্লব, ফুল, দূর্বা, তুলসীপাতা, হরীতকী, চন্দন, ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য, আতপ চাল ও বিশুদ্ধ জল। পূজা উপলক্ষে গৃহস্থের আঙিনায় চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি করা হয় নান্দনিক আলপনা এবং আঁকা হয় দেবীর ছোট ছোট পায়ের ছাপ, যা বিশ্বাস করা হয় মা লক্ষ্মীর আগমনী বার্তা বহন করে। এছাড়া মঙ্গলঘটের পাশাপাশি ধানের ছড়ার নিখুঁত সাজ পুরো পরিবেশকে এক পবিত্র ও আধ্যাত্মিক আম্রে আচ্ছন্ন করে রাখে। দেবীকে সন্তুষ্ট করতে এবং পারিবারিক কল্যাণ কামনায় বাংলার ঘরে ঘরে পাঠ করা হয় চিরায়ত লক্ষ্মীর পাঁচালি, যেখানে জড়িয়ে থাকে জনসমাজে প্রচলিত নানা উপকথা ও শিক্ষার বাণী।
আজ দেশের বিভিন্ন মন্দিরের পাশাপাশি প্রতিটি সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারের অন্দরে অত্যন্ত ঘরোয়া ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে এই পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গৃহিণীরা শুদ্ধ কাপড়ে সারাদিন উপবাস থেকে সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্জলন করে দেবীর চরণে অঞ্জলি অর্পণ করবেন। শুধু আশ্বিনী পূর্ণিমাই নয়, সনাতন সমাজের অনেক পরিবারে প্রতি বৃহস্পতিবার কিংবা কোনো কোনো অঞ্চলে দীপান্বিতা অমাবস্যার সন্ধায়ও লক্ষ্মীপূজার রেওয়াজ রয়েছে। তবে কোজাগরী পূর্ণিমার এই বিশেষ রাতটি বাঙালি হিন্দুর ঘরে ঘরে এক অনন্য ঐশ্বর্য ও শান্তির বার্তা নিয়ে আসে। পরিশেষে বলা যায়, ধর্মীয় আচার আর লৌকিক ঐতিহ্যের অপূর্ব সমন্বয়ে উদযাপিত এই লক্ষ্মীপূজা মানুষের মনে আলো, শান্তি, সমৃদ্ধি ও সৌহার্দ্যের বীজ বপন করুক এটাই সকল ভক্তের অন্তরের নিবেদন।
