জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্র সংস্কারের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আজ শুক্রবার এক বিবৃতিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এ মন্তব্য করেছে।
টিআইবি বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের কৌশলগত পরিকল্পনা ও সাহসী উদ্যোগের ঘাটতি এবং আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের সঙ্গে আপসের কারণে রাষ্ট্র সংস্কারের ভিত্তি তৈরি হয়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরেও সংবিধান সংশোধন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ক্ষমতাসীন জোটের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে বিরোধী জোটও জনস্বার্থে রাষ্ট্র সংস্কারে সহায়ক ভূমিকা রাখার বদলে দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যস্ত রয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে রাষ্ট্র সংস্কার এবং জুলাই জাতীয় সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু নির্বাচনে বিজয়ী দলের সংসদ সদস্যরা প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় সংস্কারপ্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, সংবিধান সংশোধন, আইন প্রণয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রক্রিয়া এখন ক্ষমতাসীন জোটের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে বর্তমান সরকার অনেকগুলোকে আইনে পরিণত করেছে উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, যেসব অধ্যাদেশ নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা আরও জোরদার করেছে, সেগুলোই পাস করা হয়েছে। অন্যদিকে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক অধ্যাদেশ রহিত বা স্থগিত করা হয়েছে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক শক্তির যোগসাজশে জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও দলীয়করণের চর্চায় ‘এবার আমাদের পালা’ ধরনের প্রবণতা রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নকে কঠিন করে তুলছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। বিবৃতিতে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ রহিত করার মাধ্যমে সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছে। এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংশোধন অধ্যাদেশ প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ আইনে পরিণত না করে ২০০৪ সালের আইনে ফিরে যাওয়ায় কমিশনের প্রতি আস্থার সংকট কাটানোর সুযোগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, কমিশন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ রহিত করে সম্প্রতি যে আইন করা হয়েছে, তা স্বাধীন ও কার্যকর কমিশন প্রতিষ্ঠার জন–আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ ছাড়া গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ বাতিল করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দায়ী সংস্থাগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। র্যাব বিলুপ্তির নামে নতুন পরিচয়ে সংস্থাটিকে আরও ক্ষমতাশালী করারও সমালোচনা করেছে টিআইবি। পাশাপাশি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য থাকলেও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেই বলে উল্লেখ করা হয় বিবৃতিতে।
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশের বিষয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসের মধ্যে সব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সম্পদের বিবরণী প্রকাশ এবং তা নিয়মিত হালনাগাদের বিধান নিয়ে মতৈক্য হয়েছিল। কিন্তু সংসদ সদস্যরা শপথ নেওয়ার পর এ ধরনের নির্দেশনা বা চর্চার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এসব পদক্ষেপ নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বদলে জবাবদিহিহীন ক্ষমতাকাঠামো প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি তৈরি করছে।
কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, দুদক ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পরিণতি থেকে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো কেন শিক্ষা নিচ্ছে না, সে প্রশ্নও তোলেন ইফতেখারুজ্জামান।
বিবৃতিতে টিআইবি বলেছে, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় বাংলাদেশের বিভাজিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে নজিরবিহীন রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্য অর্জনে সব রাজনৈতিক দলের প্রতি একই ধরনের সদিচ্ছা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
