
সৈয়দা আবিদা হোসেন, সাবিনা খান, সৈয়দ সাবরিনা সিদ্দিকী ও সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন-২৩-এ বিএনপির মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ করছেন ৬৮ জন নেত্রী। তাদের মধ্যে অন্তত এক ডজন নেত্রীকে ঘিরে আলোচনা থাকলেও চারজনের নাম বিশেষভাবে সামনে এসেছে।
তারা হলেন- যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত কমর উদ্দিনের মেয়ে সাবিনা খান, সিলেট-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত সৈয়দ মকবুল হোসেনের মেয়ে সৈয়দ আবিদা হোসেন, ঢাকা মহানগর বিএনপি নেতা সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক সাজুর স্ত্রী সৈয়দ সাবরিনা সিদ্দিকী এবং বিএনপির মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া।
তাদের মধ্যে কেউ পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনায় রয়েছেন, আবার কেউ দলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা ও আগের সংসদীয় অভিজ্ঞতার কারণে বিবেচনায় আছেন।
বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, আজ সোমবার সংরক্ষিত এই আসনে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পার্লামেন্টারি বোর্ডের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। রাজধানীর গুলশানে দলের চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে অনুষ্ঠেয় সভায় সভাপতিত্ব করবেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরাও এতে অংশ নেবেন। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর বোর্ড প্রার্থী বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেবে।
দলীয় সূত্র বলছে, একটি আসনের বিপরীতে ৬৮ জনের মনোনয়নপ্রত্যাশী হওয়ায় প্রার্থী বাছাইয়ে বাড়তি বিবেচনার প্রয়োজন হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলে পরিণত হওয়ার পর সংসদ সদস্য হওয়ার আগ্রহ বেড়েছে। তবে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, দলের প্রতি আনুগত্য, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।
বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে সাবিনা খানকে নিয়ে দলীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। তিনি যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত কমর উদ্দিনের মেয়ে। বাবার মৃত্যুর পর থেকে তিনি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি তার নিজস্ব রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাও মনোনয়ন বিবেচনায় আসতে পারে।
সৈয়দ আবিদা হোসেনও আলোচনায় রয়েছেন। তিনি সিলেট-৬ আসনের বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত সৈয়দ মকবুল হোসেনের মেয়ে। বাবার রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে তাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন দলের কোনো কোনো নেতা। তাঁর মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে দলীয় অঙ্গনে আলোচনা চলছে।
ঢাকা মহানগর বিএনপি নেতা সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক সাজুর স্ত্রী সৈয়দ সাবরিনা সিদ্দিকীর নামও রয়েছে আলোচনায়। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন সাজু। তবে তিনি নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য, মিরপুরের দারুস সালাম ও গাবতলী এলাকায় সাজুর সাংগঠনিক অবস্থান এবং স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয়তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তার স্ত্রীকে মনোনয়ন দেওয়ার পক্ষে রয়েছেন কোনো কোনো নেতা।
অন্যদিকে, বিএনপির মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া আগে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। সংসদীয় অভিজ্ঞতা ও দলীয় পরিচিতির কারণে তিনিও আলোচনায় রয়েছেন। তার স্বামী বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হারুনুর রশিদ। তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন, তবে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। ফলে স্বামী-স্ত্রী দুজনই বর্তমানে সংসদের বাইরে রয়েছেন।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার, অর্থাৎ রাড্ডা মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর সংরক্ষিত নারী আসন-২৩-এর তৎকালীন সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় ১ অক্টোবর তিনি পদত্যাগ করেন। একই দিন আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়।
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের নির্বাচন আইন, ২০০৪-এর ২৭ ধারা অনুযায়ী, সংসদ ভেঙে দেওয়া না হলে সংরক্ষিত নারী আসন শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন আয়োজনের বিধান রয়েছে। সে হিসাবে আসনটিতে আগামী ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা। তবে নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে তফসিল ঘোষণা করেছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১২ নভেম্বর।
তফসিল অনুসারে, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ২৬ অক্টোবর। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে ২৭ অক্টোবর এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১ নভেম্বর।
এই আসনে বিএনপি একজন প্রার্থী মনোনয়ন দিলে ভোটের প্রয়োজন হবে না। তবে একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদে বিএনপির নির্বাচিত সদস্যদের ভোটে প্রার্থী নির্ধারণের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। দলীয়ভাবে মনোনীত প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে তাই পার্লামেন্টারি বোর্ডের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাধারণ আসনে জয়ী সদস্যদের সংখ্যার অনুপাতে নারীদের জন্য সংরক্ষিত ৫০টি আসনের মধ্যে বিএনপি পেয়েছে ৩৬টি। গত ৩০ এপ্রিল দলটির ৩৬ জন সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার গেজেট প্রকাশ করা হয়। তারা ৩ মে শপথ নেন।
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের কারণে বিএনপির জন্য বরাদ্দ একটি আসন শূন্য হয়েছে। ফলে আসনটিতে অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী মনোনয়নের সুযোগ নেই। বিএনপির মনোনীত প্রার্থী নির্বাচিত হবেন, যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য একাধিক প্রার্থী না থাকেন। এ কারণে ৬৮ জনের আবেদন জমা পড়লেও শেষ পর্যন্ত দল কাকে বেছে নেয়, সেটিই এখন মূল আলোচনার বিষয়।
অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরাও আলোচনায়
চার আলোচিত নেত্রীর বাইরে আরও বেশ কয়েকজন বিএনপি নেত্রী সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন চেয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শাহানা আক্তার সানু, আয়শা সিদ্দিকা মনি, সাবেরা আলাউদ্দিন হেনা ও সিমকী ইমাম খান।
এ ছাড়া মহিলা দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক শাহিনুর নার্গিস, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক শাহিনুর বেগম, মহিলা দলের কেন্দ্রীয় মানব উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক খন্দকার ফারহানা আতিকা এবং ঢাকা মহানগর উত্তর মহিলা দলের সভাপতি রুনা লায়লাসহ আরও কয়েকজন মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন।
বিএনপির একজন নেতা বলেন, মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হবে দলের পার্লামেন্টারি বোর্ডের সভায়। এটা আমাদের দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী করা হয়। এর আগে সংসদ নির্বাচন ও সংরক্ষিত নারী আসনে এভাবেই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এবারও তাঁর ব্যতিক্রম হবে না।
