রাঙামাটির সাজেকে আটকেপড়া তিন হাজার পর্যটককে সরিয়ে আনার সময় সেনাবাহিনী ও পুলিশের সঙ্গে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে। গোলাগুলির ঘটনা সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় পর্যটকরা নিরাপদে সাজেক থেকে ফিরে এসেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে গোলাগুলি শুরু হয় এবং তা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। অন্তত ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলি করা হয়েছে।
আইএসপিআর থেকে জানানো হয়, ইউপিডিএফের একটি সশস্ত্র সংগঠন স্থানীয় জনগণকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম চলাকালে সকাল আনুমানিক ১০টায় সাজেক বাগাইহাট সড়কের গঙ্গারাম বাজার এলাকায় অবরোধকারীরা সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে পর্যটকবাহী যানবাহনের চলাচল বন্ধ করে দেয়। এ সময় সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল দল পর্যটকদের নিরাপদে যাতায়াত নিশ্চিত করতে অবরোধকারীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়। আলোচনা চলাকালে সকাল আনুমানিক ১০টা ৪৫ মিনিটে ইউপিডিএফের প্ররোচনায় অবরোধকারীরা আকস্মিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে
ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিচার্জের মাধ্যমে অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে পর্যটকবাহী যানবাহনের চলাচলের ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
আইএসপিআর জানায়, বেলা ১১টায় ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। এ সময় সেনাবাহিনীর টহল দল আত্মরক্ষা ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পাল্টা গুলিবর্ষণ করলে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বিত প্রচেষ্টায় অবরুদ্ধ পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং এ ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ইউপিডিএফের এই অবরোধ ও সহিংসতা ছিল পূর্বপরিকল্পিত। স্থানীয় জনগণকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অবরোধ ও তাদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর চলমান অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের একটি অংশ পর্যটন এলাকায় অবস্থান নিয়েছে বলে জানা যায়।
এ ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার পাশাপাশি পর্যটনশিল্প এবং স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে নিরীহ পর্যটকদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলা এবং সাধারণ জনগণকে জোরপূর্বক অবরোধ কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং স্থানীয় জনগণ ও পর্যটকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেসামরিক প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও পার্বত্য অঞ্চলের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে আইএসপিআর থেকে বলা হয়।
সাজেক রিসোর্ট ও কটেজ মালিক সমিতির সভাপতি সুপর্ণ দেব বর্মণ মঞ্জু আমাদের সময়কে বলেন, আটকেপড়া পর্যটকরা নিরাপদে ফিরে যেতে সক্ষম হয়েছেন। প্রশাসনের সহযোগিতার আশ্বাস পেয়ে আমরা পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিই। তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের অবরোধের কারণে আমরা সব সময়ই ক্ষতির মুখে থাকি। প্রায় ৩ হাজারের বেশি পর্যটক সাজেকে ছিলেন। অবরোধ ডাকা না হলে আরও অনেক পর্যটক সাজেকে ভ্রমণে আসতেন। পর্যটনকে সব সময় রাজনীতির বাইরে রাখা উচিত।
বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান জানান, সেনাবাহিনীর এসকর্টের মাধ্যমে পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
রাঙামাটি জেলার পুলিশ সুপার আবদুর রকিব বলেন, সাজেকে আটকেপড়া পর্যটকদের ফেরত আনার সময় তাদের গাড়ি লক্ষ্য করে সশস্ত্র গোষ্ঠী গুলিবর্ষণ করে। বর্তমানে সাজেকের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, গত ১১ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ‘সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি’ ও ‘সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন’ সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। পরে দুর্গাপূজার কারণে ২০ ও ২১ অক্টোবর অবরোধ শিথিল করা হয়। ২১ অক্টোবর থেকে পুনরায় অবরোধের ঘোষণা দিলে সাজেকে প্রায় ২ হাজার ৯৩৩ জন পর্যটক আটকে পড়েন।
পুলিশ সুপার আবদুর রকিব জানান, বৃহস্পতিবার সকালে আটকেপড়া পর্যটকদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল এসকট দিয়ে সকাল ৯টায় সাজেক থেকে রওনা করা হয়। গাড়ির বহর উজোবাজারে পৌঁছালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবরোধকারীদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। যাতে পর্যটকরা নিরাপদে যেতে পারেন। ওই সময়ই ইউপিডিএফের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর প্রথমে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পরে গুলিবর্ষণ করে। তখন পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সরকারি জানমাল রক্ষায় সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পাল্টা গুলিবর্ষণ করে। পর্যটকরা নিরাপদে চলে যাওয়ার পরও সশস্ত্র গোষ্ঠীটির সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর থেমে থেমে গোলাগুলি চলে। বেলা ১১টা থেকে শুরু হয়ে দুপুর ১টা পর্যন্ত এই গোলাগুলি চলে। বর্তমানে পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ও স্বাভাবিক রয়েছে।
এদিকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সাজেকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলির খবরকে ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ দাবি করেছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। সংগঠনটির প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের নিরন চাকমার পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেন, সাজেকে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটেনি। জনগণের সঙ্গে কথা বলে এমন খবরের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, সাজেক থেকে জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে সাজেকবাসীর শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ কর্মসূচি চলছে। এই কর্মসূচি বানচাল করতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নিজেরা একতরফা বিভিন্ন দিকে গুলিবর্ষণ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি অবরোধকারীদের ওপর হামলা, ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লাঠিচার্জের প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে সাজেক থেকে সন্তু লারমার দলের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।
পর্যটকরা বলছেন, রাঙামাটির পাহাড় ঘেরা অপূর্ব সুন্দর স্থান সাজেক পর্যটন এলাকা। বছরের এই সময়ে সাজেকের কটেজগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা ভিড় জমান। শীতের আগের এই মৌসুমে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার পাশাপাশি ভোরে আবাসিক হোটেলগুলোর ভেতরে ঢুকে পড়ে মেঘমালা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। প্রকৃতিতে এখন কোথাও কোথাও শীতের আমেজ শুরু হয়েছে। এই সময়ে বিকাল থেকে সাজেকে বাতাস শীতল হয়ে আসে। রাতে সড়কের দুইপাশে অবস্থিত আবাসিক হোটেলগুলো একযোগে বার বি কিউ পার্টির আয়োজন করে, যা সাজেকে বেড়াতে আসা হাজারো পর্যটকের জন্য বাড়তি আকর্ষণ। সাজেক থেকে ভারতের মিজোরাম রাজ্য দেখা যায়।
সাজেকের অবস্থান রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে হলেও সেখানে যেতে হয় খাগড়াছড়ি শহর হয়ে। সেনাবাহিনী এক্ষেত্রে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করে। খাগড়াছড়ির বাঘাইছড়ির বাঘাইহাট থেকে সাজেক পর্যন্ত পর্যটকদের আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে পুরো বহরের সামনে ও পেছনে সেনাবাহিনীর সঙ্গে পুলিশ অথবা বিজিবির সদস্যদের সশস্ত্র পাহারা থাকে। অভিযোগ রয়েছে, সাজেকে পর্যটনশিল্পের বিকাশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পাহাড়ি সংগঠন সক্রিয় রয়েছে।
আগামীকাল আধা বেলা অবরোধ : সাজেকের উজো বাজারে অবরোধকারীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের অভিযোগে আগামী শনিবার খাগড়াছড়ি এবং রাঙামাটি জেলায় আধা বেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এক বিজ্ঞপ্তিতে ‘ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ’ নামের একটি সংগঠন এ কর্মসূচি ঘোষণা করে।
সংগঠনটির ফেসবুক পোস্টে বলা হয়, সাজেকবাসীর ওপর নির্যাতন, ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে হামলা এবং গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে আধা বেলা অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, এর আগেও এই অঞ্চলে বিভিন্ন বেনামি বা সাময়িক নামে অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। স্থানীয় অনেকের মতে, এটি মূলত আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) ছদ্মবেশী উদ্যোগ। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সাজেক এলাকার ঘটনার জেরে এই নামে অবরোধের আহ্বান জানানো হয়েছে। অবরোধ কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর এ ধরনের সংগঠন বিলুপ্ত বা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় বলেও তাদের দাবি।
দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান জামায়াত আমিরের : সাজেকের চলমান ঘটনাকে কেন্দ্র করে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। গতকাল সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে এ আহ্বান জানান তিনি। জামায়াত আমির বলেন, রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেককে কেন্দ্র করে কী হচ্ছে? ভুয়া গোয়েন্দা তথ্যের পেছনে না দৌড়ে সঠিক গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, সাধারণ নাগরিকদের জীবন নিয়ে তামাশা করার অধিকার কারও নেই। সময় থাকতে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।
