চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভুক্তভোগীর আনুষ্ঠানিক অভিযোগের অপেক্ষায় না থেকে পুলিশকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা করার ক্ষমতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে নতুন আইন প্রণয়নের চিন্তাভাবনা করছে সরকার। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির জানিয়েছেন, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং ও মাদক নিয়ন্ত্রণে দেশব্যাপী যৌথ অভিযান চলছে।
একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা বাড়াতে কমিউনিটি পুলিশিংকে পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চাঁদাবাজির ঘটনায় ভুক্তভোগীরা অনেক সময় ভয়ভীতি, প্রাণনাশের হুমকি, সামাজিক চাপ কিংবা প্রতিশোধের আশঙ্কায় থানায় অভিযোগ করতে চান না। ফলে অনেক ঘটনা আড়ালে থেকে যায়।
এ অবস্থায় পুলিশের নিজস্ব উদ্যোগে মামলা করার সুযোগ তৈরি হলে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিধি বাড়তে পারে। তবে এ ক্ষমতা কার্যকর করতে হলে সুনির্দিষ্ট আইন, নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধের কার্যকর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। গতকাল শনিবার খুলনার বয়রা পুলিশ লাইনে খুলনা বিভাগের কমিউনিটি পুলিশিংবিষয়ক সুধী সমাবেশ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির এসব কথা বলেন।
আইজিপি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ বল প্রয়োগ করলে তাকে ফ্যাসিবাদী বলা হয়, আবার বল প্রয়োগ না করলে দুর্বল মনে করা হয়। গত ১৭ বছরে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সমাজে মাদককে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পুলিশ কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
অভিযোগ ছাড়াই মামলা করার উদ্যোগ : চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা করার ক্ষমতা দেওয়ার উদ্যোগকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, চাঁদাবাজির শিকার ব্যক্তি বা ব্যবসায়ী অনেক সময় প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পান না।
কেউ কেউ ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায়, আবার কেউ নিরাপত্তাহীনতার কারণে অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকেন। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ, আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হতে পারে। তবে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করার ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি কীভাবে আইনে অন্তর্ভুক্ত হবে, কোন ধরনের তথ্যের ভিত্তিতে মামলা করা যাবে এবং তদন্তের প্রক্রিয়া কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
নতুন আইনের খসড়া, অপরাধের সংজ্ঞা, তদন্তের সীমা এবং জবাবদিহির বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হলে এ উদ্যোগের বাস্তব রূপ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, পুলিশের স্বতঃপ্রণোদিত উদ্যোগে মামলা করার ক্ষমতা যেন নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করার হাতিয়ার হয়ে না ওঠে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার কারণে কেউ যাতে মিথ্যা মামলার শিকার না হন, সে জন্যও সুরক্ষা প্রয়োজন।
চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং ও মাদক নিয়ন্ত্রণে যৌথ অভিযান : চাঁদাবাজির পাশাপাশি কিশোর গ্যাং ও মাদক নিয়ন্ত্রণে দেশব্যাপী যৌথ অভিযান পরিচালনার কথা জানিয়েছেন আইজিপি। নগরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের সংঘবদ্ধ অপরাধ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, মারামারি এবং মাদককেন্দ্রিক অপরাধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে।
অন্যদিকে পরিবহন, বাজার, নির্মাণকাজ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সেবামূলক কর্মকাণ্ডে চাঁদাবাজির অভিযোগ সাধারণ মানুষের জীবন ও ব্যবসায়িক পরিবেশকে প্রভাবিত করে। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা জরুরি হলেও শুধু গ্রেপ্তার বা সাময়িক অভিযান দিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। চাঁদাবাজির পেছনে থাকা অর্থের উৎস, সংঘবদ্ধ চক্রের নেতৃত্ব, অপরাধে সহায়তাকারী ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং অপরাধলব্ধ অর্থের ব্যবহার শনাক্ত করাও প্রয়োজন।
একইভাবে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করতে হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণে সরবরাহকারী ও কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযানের সাফল্য নির্ধারণে কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, শুধু সেই পরিসংখ্যান যথেষ্ট নয়। অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট এলাকায় চাঁদাবাজি কমেছে কি না, ব্যবসায়ীরা নিরাপদ বোধ করছেন কি না এবং অপরাধী চক্রের কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে কি না, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
কমিউনিটি পুলিশিংকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উদ্যোগ : আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো কার্যকর করতে স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আইজিপি। প্রস্তাবিত কাঠামোর আওতায় কমিউনিটি পুলিশিং পুলিশের একটি শাখা হিসেবে কাজ করবে।
কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো পুলিশ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো, স্থানীয় সমস্যার তথ্য সংগ্রহ, অপরাধ প্রতিরোধে নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং পুলিশ সম্পর্কে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। এ ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া গেলে স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধের আগাম তথ্য সংগ্রহ এবং ছোটখাটো বিরোধের কারণে বড় ধরনের অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যকর করতে হলে এর দায়িত্ব, সাংগঠনিক কাঠামো, জনবল, অর্থায়ন এবং জবাবদিহির বিষয়গুলো পরিষ্কার করতে হবে।
স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ থেকে এ ব্যবস্থাকে মুক্ত রাখাও জরুরি। অন্যথায় জনগণের অংশগ্রহণে অপরাধ প্রতিরোধের উদ্যোগটি প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে। পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব কমানোর ক্ষেত্রে আচরণগত পরিবর্তন, অভিযোগ গ্রহণে আন্তরিকতা, দ্রুত তদন্ত এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। থানায় অভিযোগ জানাতে গিয়ে কেউ যেন হয়রানি বা অনীহার শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
আস্থা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ : আইজিপির বক্তব্যে পুলিশের কার্যকারিতা বাড়ানো এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে শুধু নতুন আইন কিংবা অভিযান যথেষ্ট হবে না। অপরাধ দমনে পুলিশের দৃশ্যমান সাফল্যের পাশাপাশি আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা, পেশাদারত্ব এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করার ক্ষমতা কার্যকর হলে ভয়ে অভিযোগ করতে না পারা ভুক্তভোগীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এ উদ্যোগের বাস্তব সুফল নির্ভর করবে আইনটি কীভাবে তৈরি হচ্ছে, মাঠপর্যায়ে কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে এবং পুলিশের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, তার ওপর। একইসঙ্গে চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা হওয়ার পর তদন্তের অগ্রগতি, অভিযোগপত্র দাখিল, বিচার এবং অপরাধলব্ধ অর্থ উদ্ধারের বিষয়েও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও বিচার দীর্ঘায়িত হলে কিংবা প্রভাব খাটিয়ে তারা পার পেয়ে গেলে সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়বে না।
তবে চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং ও মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের নতুন উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা, প্রমাণভিত্তিক তদন্ত এবং অপরাধ দমনে বৈষম্যহীন অবস্থানের ওপর। পুলিশের হাতে বাড়তি ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি সেই ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিআলো/অর্নব