আব্দুর রাজ্জাক, ঘিওর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি
আপডেট :
২১ অক্টোবর ২০২৬, ২২: ১৮

ধর্মের পরিচয় আলাদা, কিন্তু আনন্দের বন্ধন এক। দুর্গাপ্রতিমার বিদায়বেলায় কারও চোখে অশ্রু, কেউ দিচ্ছে উলুধ্বনি। এই আবেগের রেশ কাটতে না কাটতেই নাগরদোলা, মিষ্টির ঘ্রাণ আর মানুষের কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনে মানিকগঞ্জের ঘিওরে ২০২ বছরের ঐতিহ্যবাহী বিজয়া দশমীর মেলা পরিণত হয় সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলায়।
বুধবার (২১ অক্টোবর) ঘিওর ডি এন পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে শুরু হওয়া এ মেলা আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিকেল পর্যন্ত চলবে। ঘিওর উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের আয়োজনে মেলায় বসেছে প্রায় ৩০০টি দোকান। প্রতিমা বিসর্জন দেখতে ও মেলার আনন্দ ভাগাভাগি করতে দুই দিনই ভিড় করে বিভিন্ন বয়সী হাজারো মানুষ।
বিজয়া দশমীতে উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে দুর্গাপ্রতিমা নিয়ে আসা হয় বিদ্যালয় মাঠসংলগ্ন পুরোনো ধলেশ্বরী নদীর তীরে। বিসর্জনের আগে শেষবারের মতো প্রতিমা দেখতে ভিড় করেন দর্শনার্থীরা। ঢাকের শব্দ, উলুধ্বনি আর ভক্তদের চোখের পানিতে তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ। তবে প্রতিমা বিসর্জনের আবেগ ছাপিয়ে মেলা হয়ে ওঠে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের মিলনমেলায়।
মেলায় আসা পূজা সাহা ও জয়া সাহা জানান, ছোটবেলা থেকেই তাঁরা এ মেলায় আসছেন। বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি, কেনাকাটা আর বিসর্জনের আগে দুর্গাপ্রতিমা দেখা তাঁদের কাছে বিশেষ আনন্দের। মেলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁদের শৈশবের অনেক স্মৃতি।
মিষ্টি বিক্রেতা অজিত কুমার ঘোষ জানান, একসময় বাবার সঙ্গে মেলায় মিষ্টি বিক্রি করতেন তিনি। বাবার মৃত্যুর পরও সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। প্রায় ৩৫ বছর ধরে মেলায় দোকান দিচ্ছেন। এবার রসগোল্লা ও জিলাপি বিক্রি করেছেন প্রায় ৭০ হাজার টাকার। বিভিন্ন ধর্মের মানুষ তাঁর দোকান থেকে মিষ্টি কিনে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতেও নিয়ে যান।

ঘিওর উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সুব্রত কুমার শীল গোবিন্দ বলেন, প্রায় ২০২ বছরের ঐতিহ্য বহন করছে এ মেলা। এবারও প্রায় ৩০০টি দোকান বসেছে। দীর্ঘদিন ধরে এ মেলা বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মিলনস্থল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
পরিষদের আহ্বায়ক শচীন্দ্রনাথ মিত্র বলেন, সব ধর্মের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ মেলাটিকে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের প্রতীকে পরিণত করেছে।
উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন ভূঁইয়া বলেন, এ মেলা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবাই এখানে মিলেমিশে আনন্দ করেন। মেলার পরিবেশ ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে বিএনপি এবং সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করেছেন।
ঘিওর সদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আহিদুল ইসলাম টুটুল বলেন, সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে মেলায় অংশ নেন। পারস্পরিক সৌহার্দ্যের কারণে এই আয়োজনের আনন্দ সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
ঘিওর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহব্বত কবির বলেন, এ মেলা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। সবার নিরাপদ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করেছে।
ঘিওর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাশিতা তূল ইসলাম বলেন, এ ধরনের আয়োজন মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি জোরদার করে। দীর্ঘদিনের এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে সবার সম্মিলিত ভূমিকা জরুরি।
মেলায় আরও উপস্থিত ছিলেন ডি এন পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, ঘিওর উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কাজী ওয়াজেদ আলী মিস্টার, জেলা বিএনপির সাবেক দুর্যোগ ও ত্রাণবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল আলীম খান মনোয়ার, ঘিওর সদর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মীর কায়সার হামিদসহ স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী বিপ্লব কুমার সাহা বলেন, মেলায় সব ধর্মের মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। রাতে ধলেশ্বরী নদীতে বিভিন্ন পূজামণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। বিদায়ের মুহূর্তে ভক্তদের আবেগঘন দৃশ্যের মধ্যেও মেলার মূল সুর হয়ে থাকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি।
দীর্ঘদিনের এই ঐতিহ্য ঘিওরের মানুষের কাছে শুধু একটি মেলা নয়, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করার উপলক্ষ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সেই বন্ধনই ধরে রেখেছে বিজয়া দশমীর এই আয়োজন।

