Published on
:
2 min read
স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত
‘পুজো এলেই আমার মনে পড়ে যায় ছোটবেলার কথা। মহালয়ার ভোরে মা আর দাদা আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিতো। ওইদিন নমস্য শিল্পীদের গাওয়া গানগুলি আমাকে যে কতটা পূর্ণতা দিয়েছে, তা কোনও ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারব না। মহালয়ার পরদিন ছিল বাবার হাত ধরে পুজোর বাজার করতে বেরোনো। ড্রেস কেনার পাশাপাশি নতুন জুতোও কেনা হতো।
আমাদের ছোটবেলায় আমরা দেখেছি মণ্ডপে ঠাকুর আসতো চতুর্থী বা পঞ্চমীতে। মা বলতেন, ‘মণ্ডপে ঠাকুর এল আর আমার মেয়ের জ্বর-ও শুরু হলো’। একদম বানিয়ে বলছি না। কয়েক বছর ধরে ঠিক যেন তাই ঘটছিল। আমার কান্না পেয়ে যেত। এটা সত্যি জ্বরের জন্য আমার আনন্দের বড় ঘাটতি হতো। দু’দিন বিশ্রাম নিয়ে অন্তত অষ্টমী ও নবমী পথে বেরিয়ে পড়তাম। কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিল। বন্ধুরা মিলে খুব ঘুরপাক খেতাম আর গল্প করতাম।
ঘুরে-ঘুরে ঠাকুরের মুখ দেখার খুব আগ্রহ আমার ছোটবেলা থেকেই নেই। বরং মানুষের মুখগুলো দেখার একটা নেশা ছিল। কত মানুষ, আমি সেই সব মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। শুধু মনে হয়, এত মুখ, সেই মুখেই না লুকিয়ে আছে কত কথা। কত ব্যথা। কত আনন্দ। কত শোক। আমি এক সময়ে ছবি আঁকতাম। কফি হাউসে আড্ডা মারতে-মারতেও কত মুখের স্কেচ এঁকেছি। সেই সব মুহূর্তগুলো আমাকে আজও এক অন্য জগতে যেন পৌঁছে দেয়।
পুজোর একদিন তো পাড়ার প্যাণ্ডেলে বসতেই হবে। আগেও বসতাম, এখনও বসি। এটা এক অন্য মজা। ব্যস্ততার কারণে পাড়ায় তো বেরোনো হয় না। প্যাণ্ডেলে বসে থাকলে সেই সাক্ষাতের সঙ্গে সম্পর্কটাও ঝালিয়ে নেওয়া যায়। গান আমার পেশা হলেও ছবি তোলা আমার ভীষণ নেশা। শুধুমাত্র দুর্গাপুজো নয়, বছরভর সুযোগ পেলেই ছবি তুলি। বিভিন্ন বিষয়ের উপর তোলা ছবিগুলি নিয়ে অনেকগুলি প্রদর্শনীও হয়েছে। আগে প্যাণ্ডেলে বসে থাকলে অনেকে এসে অটোগ্রাফ চাইত। অনুষ্ঠানে গেলেও তাই হতো। এখন তো সেই সব বালাই নেই। এখন সেলফির যুগ। পরপর চলতে থাকে ছবি তোলার বায়না। এনজয় করি।
একবার হয়েছিল কী, অষ্টমীর রাতে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম। তখন কলেজে পড়ি। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সংখ্যা ছিল আমাকে নিয়ে দশজন। হেঁটে-হেঁটে এক প্যাণ্ডেল ছেড়ে অন্য প্যাণ্ডেলে ঢুকছি সবাই দলবেঁধে, তখনই যেন ঘটল যত বিপত্তি। মাইকে উচ্চস্বরে বাজছে কিশোর কুমারের হিট গান, ‘আরে দিওয়ানো, মুঝে পহেচানো... ম্যায় হুঁ ডন’।
গানটি শুনতে গিয়ে কয়েক মিনিটের জন্য থমকে যাওয়া। দমকা হাওয়ার মতো ভিড় ছিটকে দিল নিজেকে। কোথায় আমার বন্ধুরা? ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেললাম। এখন কী হবে? শেষে এক কাকু আমার কান্না দেখে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিলেন। সঙ্গে জুটেছিল মায়ের বকুনি।’
অনুলিখন: বিপ্লবকুমার ঘোষ