আমাদের জাতীয় জীবনে কতগুলী স্পর্শকাতর বিষয় রয়েছে। দৈনিক ‘সংগ্রাম’ এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কোনো দিন সচেতনভাবে এসব বিষয় টাচ করে না। তারপরেও দেখা যায়, গায়ে পড়ে কিছু তথাকথিত প্রগতিবাদী ঐসব ইস্যু খুঁচিয়ে তোলে এবং শুধু জামায়াত নয়
আসিফ আরসালান
আমাদের জাতীয় জীবনে কতগুলী স্পর্শকাতর বিষয় রয়েছে। দৈনিক ‘সংগ্রাম’ এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কোনো দিন সচেতনভাবে এসব বিষয় টাচ করে না। তারপরেও দেখা যায়, গায়ে পড়ে কিছু তথাকথিত প্রগতিবাদী ঐসব ইস্যু খুঁচিয়ে তোলে এবং শুধু জামায়াত নয়, যারা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ এবং ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাস করেন তাদেরকে মৌলবাদী প্রতিক্রিয়াশীল ইত্যাদি বলে গালাগালি করে। এখন আর তাদের টার্গেট জামায়াত নয়। বরং ড. ইউনূস সহ যারাই আওয়ামী আমলে নির্যাতিত হয়েছেন তারা এবং অন্তর্বর্তী সরকার ওদের টার্গেট হয়েছে। কোনো প্রসঙ্গ লাগে না। অপ্রাসঙ্গিকভাবে ওরা ইস্যু তৈরি করে এবং গালাগালি শুরু করে। তেমনি একটি ইস্যু হলো, দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক সেগুন বাগিচায় দেওয়াল গাত্রে কতিপয় ব্যক্তির গ্রাফিতি আঁকা। সে গ্রাফিতির একজনের চিত্রে চুনকালি দেওয়ার প্রতিবাদের বাহানায় নিউইয়র্কের বাংলাদেশের সবচেয়ে বরেণ্য ব্যক্তি ড. ইউনূসের হেনস্তা।
দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন সৌন্দর্য বর্ধনের নামে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর সামনের দেওয়ালে ১০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির গ্রাফিতি এঁকেছিলো। প্রথমে ৭ জনের গ্রাফিতি আঁকা হয়। এরা হলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, ফকির লালন শাহ, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়, অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি এবং সঞ্জীব চৌধুরী। পরে অজ্ঞাত কারণে সঞ্জীব চৌধুরীর গ্রাফিতি সরিয়ে ফেলা হয় এবং নতুন ৩ জনের গ্রাফিতি আঁকা হয়। এরা হলেন, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, পল্লী কবি জসিমউদ্দিন এবং কবি জীবনানন্দ দাস। এসব গ্রাফিতি আঁকা নিয়ে শিল্পকলা একাডেমী অনেক কথা বলেছে। কিন্তু সেগুলি প্রাসঙ্গিক নয় বলে আজ আমি সেপ্রসঙ্গে যাচ্ছি না।
এর মধ্যে একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যায়। কে বা কারা গত ১০ অক্টোবর শনিবার রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতির ওপর কালি লেপন করে। সর্বশেষ প্রাপ্ত সংবাদ মোতাবেক, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি দেওয়ার ঘটনায় ১১ অক্টোবর রবিবার ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ৪ জন হলেন, আ ন ম আয়াস, মো. সাকিবুল হাসান, মো. সুজন মিয়া এবং মারজিয়া খন্দকার রিমি। এদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি ছিঁটালে সেটা কি রাষ্ট্রদ্রোহ হয়ে যায়? কোন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ? বাংলাদেশের বিরুদ্ধে? বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রদ্রোহের কোনো আইন নেই। তবে ১৮৬০ সালের পেনাল কোডের ১২৪/ক ধারায় রাষ্ট্রদ্রোহের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এ সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, 124A. Whoever by words, either spoken or written, or by signs, or by visible representation, or otherwise, brings or attempts to bring into hatred or contempt, or excites or attempts to excite disaffection towards, the Government established by law shall be punished with imprisonment for life or any shorter term, to which fine may be added, or with imprisonment which may extend to three years, to which fine may be added, or with fine.
অর্থাৎ “কেউ মৌখিক বা লিখিত কথা, চিহ্ন, দৃশ্যমান উপস্থাপনা বা অন্য কোনো উপায়ে আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণা বা অবজ্ঞা সৃষ্টি করলে, কিংবা তা সৃষ্টির চেষ্টা করলে; অথবা সরকারের প্রতি আনুগত্যহীনতা বা বিদ্বেষ উসকে দিলে কিংবা উসকে দেওয়ার চেষ্টা করলে, এ ধারায় শাস্তিযোগ্য হতে পারেন”।
এ ধারায় কোনো ব্যক্তির ছবিতে কালি ছিঁটালে সেটা কি রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে পড়ে?
ঐ দিকে নিউইয়র্ক সময় ১২ অক্টোবর বিকেল ৪টায় নিউইয়র্কের কেনেডি বিমান বন্দরে ৫ ব্যক্তি হুইল চেয়ারে বসা অসুস্থ বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব ড. ইউনূসকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে এবং তাকে হেনস্তা করে। যারা ড. ইউনূসকে হেনস্তা করে তাদের মধ্যে রয়েছে আমেরিকায় যুবলীগের কর্মী সাগর চৌধুরী, নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ চৌধুরী, সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী, নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল এবং জ্যাকসন হাইটস আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর কায়সার।
এ ৫ ব্যক্তির নেতৃত্বে কেনেডি বিমানবন্দরের ৮ নম্বর টার্মিনালে একদল আওয়ামী রাফিয়ান ভুলভাল ইংরেজিতে ড. ইউনূসকে বলে, You terrorist,Why you come here, Why did you come here, Go back ইত্যাদি। ইংরেজি সম্পর্কে যাদের নূন্যতম জ্ঞান আছে তারা জানেন, এ ৪টি বাক্যের একটিও শুদ্ধ ইংরেজি নয়। তারা তো স্লোগান দেয় নি, মনে হয় তীব্র ক্রুদ্ধ হয়ে চিৎকার শুরু করে। আসলে ড. ইউনূসকে শারিরীকভাবে লাঞ্ছিত করার মতলব ছিলো তাদের। তখন ড. ইউনূসের হুইল চেয়ার যে ব্যক্তি টানছিলেন তার পাশে কয়েক জন সাধারণ মানুষ জড়ো হন। তারা ড. ইউনূসকে প্রটেকশন দিয়ে আবার টার্মিনালের ভেতর নিয়ে যায়। এ ঘটনায় ঢাকার একজন চিকিৎসক তার ফেসবুক পেজে লেখেন, “নোবেল বিজয়ীদের ছবিতে একদিকে কালি, আরেক নোবেল বিজয়ীর চেয়ারে গালি। কবি গুরু বলেছিলেন, যাদের করেছো অপমান, অপমানে হতে হবে তাদের সবার সমান”।
যে ব্যক্তি এমন পোস্ট দিয়েছেন তিনি পেশায় একজন চিকিৎসক। এর আগে একটি টেলিভিশনে কাজ করতেন। এখন করেন কিনা জানিনা। তবে ইদানিং কিছুটা মশহুর হওয়ার কোশেশ করছেন। স্থান কাল পাত্র বিবেচনা না করে যেখানে সেখানে ড. ইউনূস এবং জামায়াতে ইসলামীকে গালাগালি করছেন। যখন তিনি টেলিভিশনে কাজ করতেন তখন এবং এখনো তিনি প্রথম দিকে নিরপেক্ষতার ভান করলেও অতিশীঘ্রই তার নিরপেক্ষতার মুখোশ খুলে পড়ে। মুখোশ উন্মোচিত হলে দেখা যায়, তিনি একজন পাঁড় আওয়ামী লীগার। কোথায় ঢাকায় রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি, আর কোথায় নিউইয়র্কে ড. ইউনূসকে গালি।
ড. ইউনূস ৮৬ বছর বয়স্ক এক বয়োবৃদ্ধ। এ ৮৬ বছরে একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধেও তিনি কটু বাক্য উচ্চারণ করেছেন, এমন কথা কেউ বলতে পারবে না। অথচ তার মতো একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় অসুস্থ ব্যক্তিকে এভাবে ওরা তেড়ে মারতে গিয়েছিলো। ড. ইউনূসের অপরাধ কী? অপরাধ হলো, বাংলাদেশের ১৮ কোটি ছাত্র জনতা শেখ হাসিনাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করার পর ছাত্র-জনতার বারংবার অনুরোধে তিনি প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ড. ইউনূস তার ১৮ মাস শাসনকালে কঠোরভাবে নিরপেক্ষতা বজায় রাখেন। তিনিই এক ব্যক্তি যিনি সারা বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন দিয়ে নিজের পুরোনো পেশায় ফিরে গেছেন। সারা দেশের প্রায় সমস্ত মানুষের সমর্থন যখন তার পেছনে ছিলো তখন তিনি ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছেন। বিশ্বের ইতিহাসে এমন নজীর একেবারে যে নাই তা নয়, তবে তার সংখ্যা হাতে গোনা যায়। ড. ইউনূসের আরো অনেক সাফল্য আছে। সেই সাফল্যের ফিরিস্তি দেওয়ায় জায়গা এটা নয়। ড. ইউনূসকে হেনস্তা করার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন আমীরে জামায়াত ড. শফিকুর রহমান এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। ড. ইউনূস কাকে অপমান করেছেন যে, তার জন্য নিউইয়র্কে তাকে অপমানিত হতে হলো? রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি ছিঁটিয়েছেন কি ড. ইউনূস? নাকি তার উপদেষ্টা পরিষদের কেউ? পুলিশ তো ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে। তারা তাদের পরিচয় উদ্ঘাটন করুন না কেন?
তবে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি ছিঁটানোর পাল্টা আঘাত হিসাবে ইউনূসকে হেনস্তা করায় কার লাভ হলো? কার ক্ষতি হলো? রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে দৈনিক সংগ্রাম বা জামায়াতে ইসলামী কোনো দিন কোনো কটাক্ষ করা তো দূরের কথা কোনো দিন কোনো বিরূপ মন্তব্যও করে নি। কিন্তু তাই বলে কি অন্যদের মুখ বন্ধ করে রাখা যায়? এখন তো যাদের গ্রাফিতি আঁকা হচ্ছে তাদেরকে নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
সত্যজিৎ রায় একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার। বাংলাদেশের দেয়াল চিত্র বা গ্রাফিতিতে তার ছবি থাকার কারণটি কী? বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তার কি কোনো অবদান ছিলো? তিনি তো মারা গেছেন ১৯৯২ সালে। অর্থাৎ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ২১ বছর পর। ঐ ২১ বছর আগেই বা তার কি ভূমিকা ছিলো? আর পরেই বা কী?
তিনি একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ছবি নির্মাতা। সেটি বিবেচনায় নিলে তো আরো অনেকেরই গ্রাফিতি আঁকতে হয়। জাপানের আকিরা কুরোসাওয়া, ইতালির ফেদেরিকো ফেল্লিনি, সুইডেনের ইংমার বার্গম্যান, ব্রিটেনের চার্লি চ্যাপলিন ইত্যাদি কত নামই তো উল্লেখ করতে হয়। তাহলে কি এদের সকলের নামেই গ্রাফিতি আঁকতে হবে?
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নামে গ্রাফিতি আঁকতে হবে কেনো? তিনি সতিদাহ প্রথার বিরোধিতা করেছেন। এটি তো হিন্দুদের বিষয়। তিনি কষ্ট করে লেখাপড়া করেছেন। এমন তো অনেকেই করেছেন। তিনি খুব মাতৃভক্ত ছিলেন। এমন তো অনেকেই আছেন বা ছিলেন। তাই বলে কি তাদের সকলের নামেই গ্রাফিতি আঁকতে হবে? প্রথম পর্বে যে ৭টি নাম দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে পল্লী গীতির আইকন আব্বাস উদ্দিনের নাম নেই কেনো? ব্রিটিশ আমলে মুসলমান গায়ক-গায়িকা খুঁজেই পাওয়া যেতো না। আর থাকলেও তাদেরকে হিন্দু প্রডিউসার বা গ্রামোফোন কোম্পানী কোনো সুযোগই দিতেন না। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে দিয়ে ঈদের সে প্রসিদ্ধ গান, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলা খুশির ঈদ’, তো আব্বাস উদ্দিনই লিখিয়ে নিয়েছিলেন। তার পরেও সেটির গ্রামোফোন রেকর্ড বের করা, তাও আবার মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ আনন্দ উৎসবকে নিয়ে, খুব কঠিন ছিলো। আব্বাস উদ্দিন সেই অসাধ্য সাধন করেছিলেন।
‘ও কি গাড়িয়াল ভাই’, ‘গেইলে কি আর আসিবেন মোর মাহুত বন্ধুরে’, ‘আল্লাহ মেঘ দে, পানি দে, ছায়া দে রে তুই আল্লাহ’, প্রভৃতি কালজয়ী গানের গায়ক আব্বাস উদ্দিনের গ্রাফিতি প্রথম ৭ জনের মধ্যে এলো না কেনো?
রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে একটিও বিরূপ মন্তব্য এখানে আমি করি নি। তবে শেষ করছি একটি প্রশ্ন দিয়ে। মুসলমান কবি নজরুল ইসলাম অসংখ্য শ্যামা সঙ্গীত রচনা করেছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কি একটিও ইসলামী গান রচনা করেছেন?
Email:asifarsalan15@gmail.com
