মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দুই পক্ষের মধ্যে এই যোগাযোগ ও আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে কাতার। মধ্যস্থতাকারীরা চেষ্টা চালিয়ে গেলেও মাঠপর্যায়ের কঠিন বাস্তবতায় স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কাতারের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেন, ‘সংঘাত যদি এভাবেই বাড়তে থাকে, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে।’ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দোহার গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোরামে তিনি বলেন, ‘যেকোনো যুদ্ধবিরতি কোনো গন্তব্য নয়, বরং শান্তির দিকে পৌঁছানোর একটি দরজা মাত্র।’
এদিকে আলোচনায় অচলাবস্থা নিরসনে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তেহরান সফরে গেছেন। সফরে তিনি ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। আলোচনায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি গুরুত্ব পাবে বলে জানিয়েছে তেহরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান আলোচনা এবং কূটনীতির অচলাবস্থার পেছনে কৌশলগত হিসাব-নিকাশ কাজ করছে। চারটি ইরানি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল যেন বড় ধাক্কা খায়, সে জন্য তেহরান ইচ্ছাকৃতভাবে আলোচনা দীর্ঘায়িত করছে।
আট মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে উচ্চমূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ট্রাম্পের জনসমর্থন ইতোমধ্যে রেকর্ড পতন হয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন নৌঅবরোধ এবং কঠোর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতিও ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।
ইরানে আবার হামলার ইঙ্গিত দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, ইরান সরকারের পতন ঘটাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গত সোমবার ইসরায়েল সফরে গিয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। সেখানে আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলায় দুই দেশের প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা মঙ্গলবার সকালে হরমুজ প্রণালীর ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক এমকিউ-৯ ড্রোন ধ্বংস করেছে। এ ছাড়া প্রণালীতে নৌমাইনে আঘাতের পর একটি সুপার ট্যাংকারে আগুন ধরে গেছে বলেও জানিয়েছে বাহিনীটি। তাদের দাবি, জাহাজটি নেভিগেশন ও রাডার ব্যবস্থা বন্ধ করে ইরানের
সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল। ট্যাংকারটিতে ২০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল ছিল। এর আগে আরও দুটি ট্যাংকারে আগুন লাগার দাবি করেছিল আইআরজিসি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড এ দাবি ‘ভুল’ বলে জানিয়েছে আলজাজিরাকে।
যুদ্ধের শুরু থেকে ইরানের এই হামলা-অবরোধে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ রয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। তবে এইচএসবিসির প্রধান নির্বাহী জর্জ এলহেদারি জানিয়েছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প পাইপলাইন ও লজিস্টিক রুটে বড় ধরনের বিনিয়োগ শুরু করেছে। ফলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে হরমুজ প্রণালী কৌশলগতভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প। কানসাসের এক নির্বাচনী সমাবেশে তিনি বলেন, ‘ইরানের নৌবাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়েছে এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতার প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের নেতৃত্ব পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।’
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমিত করতে এবং মার্কিন-ইরান আলোচনার পথ উন্মুক্ত করতে মস্কোও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ তেহরান সফর করে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন। বৈঠক শেষে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইতিহাসে এই প্রথম ইরান ও রাশিয়া এত ঘনিষ্ঠভাবে একসঙ্গে কাজ করছে।
