আজকাল ওয়েবডেস্ক: ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে 'দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'-এর একটি প্রতিবেদন ভারতের নির্বাচন কমিশনের অন্দরের সমীকরণকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। আর এই ঝড়ের কেন্দ্রে উঠে এসেছে দেশটির ২৬তম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নাম, যিনি ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি এই সাংবিধানিক শীর্ষ পদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
উত্তরপ্রদেশের শ্রেণিকক্ষ থেকে দেশের অন্যতম শীর্ষ কারিগরি প্রতিষ্ঠান, আর সেখান থেকে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর—জ্ঞানেশ কুমারের জীবনপঞ্জি যেন এক দীর্ঘ এবং নজরকাড়া যাত্রাপথ। ১৯৬৪ সালে আগ্রার সঙ্গে সংযুক্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া কুমারের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় উত্তরপ্রদেশেই। গোরক্ষপুর, লখনউ এবং কানপুরে তাঁর শিক্ষাজীবনের বড় একটা অংশ কেটেছে। মেধার পরিচয় তিনি দিয়েছিলেন একদম শুরু থেকেই; উত্তরপ্রদেশ বোর্ডের পরীক্ষায় ১৯৭৯ সালের হাইস্কুল এবং ১৯৮১ সালের ইন্টারমিডিয়েট—উভয় পরীক্ষাতেই তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর সাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লখনউয়ের কোলভিন তালুকদার কলেজে গিয়ে তিনি এই শহরকে নিজের ‘তপোভূমি’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি ভর্তি হন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) কানপুরে। ১৯৮৫ সালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বি.টেক ডিগ্রি লাভ করেন এবং এর পরপরই শুরু হয় তাঁর সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি। তবে তাঁর পড়াশোনা শুধু ইঞ্জিনিয়ারিংয়েই সীমাবদ্ধ ছিল না। আইসিএফএআই থেকে বিজনেস ফাইন্যান্স এবং পরবর্তীতে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এইচআইআইডি থেকে পরিবেশ অর্থনীতি নিয়েও উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন তিনি। শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৫ সালের নভেম্বরে আইআইটি কানপুর তাঁদের ৬৬তম প্রতিষ্ঠা দিবসে তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ ‘বিশিষ্ট প্রাক্তন ছাত্র সম্মান’ প্রদান করে।
১৯৮৮ ব্যাচের আইএএস অফিসার হিসেবে কেরল ক্যাডারে যোগদানের মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ প্রশাসনিক জীবন। কোচিন পুরসভার কমিশনার, এরনাকুলামের জেলাশাসক, কেরল স্টেট কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কের ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং দিল্লিতে কেরল হাউসের রেসিডেন্ট কমিশনার হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন দক্ষতার সঙ্গে কাজ পরিচালনা করেন। পরবর্তীতে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে যুগ্ম সচিব এবং অতিরিক্ত সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বভার সামলান, যে সময়টিতে জম্মু-কাশ্মীর এবং অযোধ্যা সংক্রান্ত একাধিক বড় জাতীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হচ্ছিল।
২০২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর, সেই বছরেরই ১৫ মার্চ তাঁকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তিনি ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন। এরপর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি দেশের ২৬তম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হন। উত্তরপ্রদেশের পরীক্ষার হল থেকে শুরু করে আইআইটি কানপুরের ক্যাম্পাস, কেরলের প্রশাসনিক পরিমণ্ডল থেকে দিল্লির নির্বাচন সদন—জ্ঞানেশ কুমারের এই দীর্ঘ কর্মজীবন এবং মেধার স্বাক্ষর আজকের রাজনৈতিক তর্কবিতর্কের মাঝেও বিশেষভাবে নজর কাড়ে।
