পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কালাইয়া বন্দরে মসজিদের মাত্র ১০ ফুট দূরে মন্দিরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। কোনো ধর্মীয় সংঘাত বা বিভেদ নয়; বরং ধর্মীয় সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির এক চমৎকার পরিবেশে এখানে আনন্দ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে পূজার যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা।
সরেজমিন দেখা যায়, কালাইয়া বন্দরে অবস্থিত প্রায় আড়াইশ বছরের পুরোনো শ্রীশ্রী মদন মোহন জিউর আখড়া বাড়ি এবং কালাইয়া হাজি জামে মসজিদের দূরত্ব মাত্র ১০ ফুট। পূজামণ্ডপে বাজতে থাকা ঢাকঢোল ও কাঁসার শব্দে প্রতিবেশী মুসলিম সম্প্রদায় বিরক্ত হওয়া তো দূরের কথা; বরং তারা এই আনন্দ উপভোগ করছেন এবং পূজা আয়োজনে নানাবিধ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
উৎসবের দিনগুলোতে পূজামণ্ডপে ভক্তের ঢল নামলেও আজান ও নামাজের সময় হিন্দু সম্প্রদায় স্বপ্রণোদিত হয়ে ঢাকঢোল, কাঁসার ঘণ্টা ও শব্দযন্ত্র বন্ধ রাখেন। আবার নামাজ শেষ হতেই পুনরায় শুরু হয় পূজার ধর্মীয় আচার ও সাউন্ড সিস্টেম।
কোনো লিখিত সরকারি আদেশ বা চুক্তি ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ওপর ভিত্তি করে উদযাপিত হয়ে আসছে এই সম্প্রীতির পূজা।
স্থানীয়দের সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন মল্লিকপুর এলাকায় জনৈক জমিদার ভারতের বিহার থেকে সেবাইত এনে শ্রীশ্রী মদন মোহন জিউর আখড়া বাড়িটি প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা শুরু করেন। সঠিক সন-তারিখের লিখিত দলিল না থাকলেও প্রতিষ্ঠাতাদের আমল ও বংশানুক্রমিক হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী এর বয়স আড়াইশ বছরের কিছু বেশি। বর্তমানে ৩৫.৫০ শতাংশ জমির ওপর অবস্থিত এই আখড়া বাড়িতে প্রতি বছরের মতো এবারও সাড়ম্বরে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, এই মন্দিরের ঠিক ১০ ফুট দূরত্বে ১৯৮৬ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে ১৯৮৮ সালে উদ্বোধন করা হয় কালাইয়া হাজি জামে মসজিদ।
মসজিদের ১০ ফুট দূরে দুর্গাপূজা উদযাপন ও সম্প্রীতি প্রসঙ্গে মন্দির কমিটির সভাপতি অতুল চন্দ্র পাল বলেন, ‘মদনমোহন আখড়া বাড়িটি আড়াইশ বছরেরও বেশি পুরোনো। আজান ও নামাজের সময় মন্দিরের যাবতীয় সাউন্ড ও ঢাকের বাদ্য বন্ধ রাখি। মুসলিম ভাইয়েরাও আমাদের এই দুর্গাপূজার উৎসবে পাশে থাকেন, নিরাপত্তা ও সার্বিক সহযোগিতা নিশ্চিত করেন। এটিই আমাদের আসল শক্তি।’
মসজিদ কমিটির সভাপতি আলহাজ আবদুল খালেক সরদার বলেন, ‘মসজিদের মাত্র ১০ ফুট দূরে মন্দিরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হলেও আমাদের কখনো কোনো অসুবিধা হয়নি। আজান ও নামাজের সময় হিন্দু ভাইয়েরা নিজেরাই ঢাক-ঢোল ও শব্দযন্ত্র বন্ধ রাখেন। এই সম্প্রীতি আমাদের বহুদিনের ঐতিহ্য।’
