ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে অভিনেতা অরবিন্দ স্বামীর যাত্রাটি ছিল অনেকটা প্রথাগত ধারার বাহিরে। নব্বইয়ের দশকে তামিল সিনেমার বেশ পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার পর, হঠাৎ তিনি ব্যবসার কারণে অভিনয় থেকে সরে দাঁড়ান। একটি আঘাতে পা পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল অরবিন্দ স্বামীর। লম্বা সময় পর সেরে ওঠে আবার তিনি সিনেমায় ফিরে মনোযোগ দেন ক্যারিয়ারে।
মজার ব্যাপার, অভিনয় অরবিন্দের কখনোই প্রথম পছন্দ ছিল না। তিনি ডাক্তার হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বাবার ইচ্ছের কারণে যোগ দেন ব্যবসায়। অভিনয় ক্যারিয়ারের পাশাপাশি তিনি নিজেকে একজন উদ্যোক্তা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেন। ২০২২ সালে তার কোম্পানি 'ট্যালেন্ট মেক্সিমাস ইন্ডিয়া'র আর্থিক মূল্য ছিল ৩,৩০০ কোটি রুপি। সম্প্রতি একটি পডকাস্টে এই অভিনেতা তার ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, সিনেমায় ফেরা এবং ব্যবসা নিয়ে কথা বলেছেন। অভিনেতা আরো বলেছেন যে, তিনি নিজেকে একজন ভালো ব্যবসায়ী মনে করেন না।
অরবিন্দ স্বামী হতে চেয়েছিলেন ডাক্তার
অ্যাপোলো হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ড. প্রতাপ সি রেড্ডীর দ্বারা অরবিন্দ অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন ডাক্তারি পেশার জন্য। কিন্তু তার ব্যবসায়ী বাবা ভিডি স্বামী চেয়েছিলেন তিনি যেন ব্যবসার জগতেই পা রাখেন। পডকাস্টে অভিনেতা বলেন, ডাক্তার প্রতাপ সি রেড্ডী ছিলেন তাদের পরিবারের মতোই, এবং তিনি তাকে দেখেই অনুপ্রেরণা পান। কিন্তু তার বাবার ইচ্ছে ছিল অন্যরকম।
অরবিন্দ স্বামী ১৯৯১ সালে মণি রত্নমের ‘থালাপতি' চলচ্চিত্রের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন। এই ছবিতে রজনীকান্ত ও মামুট্টি অভিনয় করেছিলেন। তবে তার পরবর্তী চলচ্চিত্র ‘রোজা’ (১৯৯২) তাকে রোমান্টিক নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং দর্শকদের হৃদয়ে স্থান গড়ে দেয়।
পরবর্তী সময়ে তিনি ‘পাসামালারগাল’ (১৯৯৪), ‘বোম্বে’ (১৯৯৫) এবং ‘মিনসারা কানাবু’ (১৯৯৭)-এর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ব্যাপক জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও, এই অভিনেতা জানিয়েছেন যে তারকা হয়ে ওঠা কখনোই তার লক্ষ্য ছিল না।
কেন অরবিন্দ স্বামী সিনেমা থেকে সরে গিয়েছিলেন?
দুই হাজারের শুরুর দিক থেকে অরবিন্দ অভিনয় জগত থেকে সরে যেতে থাকেন ব্যবসায় মনোযোগ দেওয়ার জন্য। ২০১৩ সালে ‘দ্য হিন্দু’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, এই সিদ্ধান্তটি ছিল সাময়িক।
তিনি ওই প্রকাশনাটিকে বলেছিলেন, 'আমার গ্লোবাল প্রসেস আউটসোর্সিং ব্যবসা শুরু করার জন্য এটি ছিল একটি রোমাঞ্চকর সময়। আমি ভেবেছিলাম ৪-৫ বছরের বিরতি নিয়ে আবার চলচ্চিত্রে ফিরে আসব।'
পরবর্তীতে তিনি ‘ভিডি স্বামী অ্যান্ড কোম্পানি’-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা ইস্পাত রপ্তানি করত বলে জানা যায়। এছাড়া তিনি ‘ইন্টারপ্রো গ্লোবাল’-এর প্রেসিডেন্ট এবং ‘প্রোলিজ ইন্ডিয়া’-এর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন।
অরবিন্দের পায়ে আঘাত এবং পঙ্গুত্বের সময়
ব্যবসায়িক কর্মজীবন গড়ার পাশাপাশি অরবিন্দ স্বামী একটি বড় ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি হয়েছিলেন। ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে একটি দুর্ঘটনায় তার মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এর ফলে তার একটি পা পঙ্গু হয়ে যায়। সুস্থ হতে তার বেশ কয়েক বছর সময় লেগেছিল, যা তার শারীরিক সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলেছিল।
তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, "আমার একটি পা পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল। আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চার-পাঁচ বছর চিকিৎসা নিতে হয়েছে। আমি কোনো শারীরিক ব্যায়াম করতে পারছিলাম না, ফলে আমার ওজন অনেক বেড়ে গিয়েছিল।"
অবশেষে চলচ্চিত্র নির্মাতা মণি রত্নমের হাত ধরেই তার আবার অভিনয়ে প্রত্যাবর্তন ঘটে—যিনি একসময় তাকে চলচ্চিত্র জগতে নিয়ে এসেছিলেন। ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকে দু’জনের মধ্যাহ্নভোজের সময় আবারও একসঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে কথাবার্তা হয়।
নিজের উদ্বেগের কথা জানিয়ে অরবিন্দ স্বামী পরিচালককে বলেছিলেন, 'আমার অবস্থা দেখুন, আমি শারীরিকভাবে মোটেও ভালো নেই। আমার ওজন অনেক বেড়ে গেছে। অতীতে যে শারীরিক কষ্টের মধ্য দিয়ে গিয়েছি, তা নিয়ে আমি আতঙ্কিত।'
এত শঙ্কা থাকা সত্ত্বেও, ২০১৩ সালে 'কাদাল' সিনেমার মাধ্যমে তিনি পর্দায় ফিরে আসতে সম্মত হন। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে 'থানি ওরুভান' সিনেমায় তার অভিনয় ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় অধ্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়।
এরপর তিনি 'ধ্রুবা' (২০১৬), 'বোগান' (২০১৭), 'চেক্কা চিভান্থা ভানাম' (২০১৮), 'থালাইভি' (২০২১), 'কাস্টডি' (২০২৩), 'মেইয়াঝাগান' (২০২৪), 'আইসি ৮১৪: দ্য কান্দাহার হাইজ্যাক' (২০২৪) এবং 'তানভি দ্য গ্রেট' (২০২৫)-এর মতো চলচ্চিত্র ও ওয়েব সিরিজে অভিনয় করেন।
ব্যবসার ক্ষেত্রে অরবিন্দ নিজেকে নিয়ে বলেছেন, 'আমি একজন খারাপ ব্যবসায়ী'
একটি সফল ব্যবসা গড়ে তোলা সত্ত্বেও, অরবিন্দ স্বামী জানিয়েছেন যে কোনো প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক দিকগুলো পরিচালনার চেয়ে সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার মধ্যেই তার মূল আগ্রহ।
অরবিন্দ বলেন, 'আমার কাছে আসল আগ্রহের বিষয় হলো কোনো সমস্যার সমাধান তৈরি করা। আমি মূলত একজন সমস্যা সমাধানকারী। একবার সমাধান বের হয়ে গেলে, ব্যবসাটি চালানোর জন্য অন্য মানুষ আছেন, আর আমি তখন নতুন কোনো সমস্যার সমাধানে মনোনিবেশ করি। দৈনন্দিন ব্যবসায়িক কার্যক্রম আমাকে খুব একটা আকর্ষণ করে না। আমার আগ্রহ কেবল ওই সমস্যা সমাধানের বিষয়টিতেই থাকে। এটি শেষ পর্যন্ত একটি ব্যবসায় রূপ নেওয়াটা কেবল একটি আনুষঙ্গিক ঘটনা মাত্র। সেই অর্থে, আমি একজন খারাপ ব্যবসায়ী। কেবল মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে কীভাবে কাজ করতে হয়, তা আমার জানা নেই।'
