তহবিলের ঘাটতির কারণে বন্ধ হচ্ছে গাজায় পাঁচ লাখ মানুষের ত্রাণ
দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ আর ক্ষুধার সাথে লড়াই করে টিকে আছে অবরুদ্ধ গাজাবাসী। তবে এবার তাদের সামনে আসছে আরও বড় হুমকি। আন্তর্জাতিক সাহায্য কমার আশঙ্কায় গাজার মানুষ পড়তে যাচ্ছেন চরম খাদ্য ঝুঁকিতে।
জাতিসংঘের খাদ্য সহায়তা সংক্রান্ত শাখা ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, তহবিলের ঘাটতির কারণে গাজায় পাঁচ লাখ মানুষের জন্য খাদ্য সহায়তা কমিয়ে দিতে হবে। সম্প্রতি কিছু অঞ্চলে সাময়িকভাবে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হলেও, এই ত্রাণ কমানোর সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আবার মারাত্মক সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
গাজা ও পশ্চিম তীরে আগামী ছয় মাস নিয়মিত খাদ্য সহায়তা চালু রাখতে ডাব্লিউএফপির প্রায় ৩৮৬ মিলিয়ন থেকে ৪৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার তহবিলের জরুরি প্রয়োজন। কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় তারা মোট সহায়তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। ১৯ অক্টোবর এক ব্রিফিং-এ ডব্লিউএফপি-র ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক কার্ল স্কাউ বলেন, ''এটা ঠিক যে, আমরা দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিকে রুখে দিতে পেরেছি। খাদ্য নিরাপত্তার অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। তবে এটি সম্ভব হয়েছে গত এক বছর ধরে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির ব্যাপক প্রচেষ্টার কারণে। আমরা প্রতি মাসে প্রায় পুরো জনগোষ্ঠীর কাছে গরম খাবার ও খাদ্যসামগ্রীর প্যাকেট পৌঁছে দিচ্ছি। গাজার ৮০ শতাংশ বেকারিকে আমরা সহায়তা করছি। এছাড়া, ইউনিসেফ , ইউএনআরডব্লিউএ এবং অন্যান্য অংশীদারদের সাথে মিলে আমরা শিক্ষা কেন্দ্রগুলো পুনরায় চালু করতে শুরু করেছি। এই শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে আমরা শিশুদের জন্য স্কুল-খাবারের ব্যবস্থা করছি। কিন্তু পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয় এবং মানুষ এখনো পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না। এমন প্রেক্ষাপটেই আমরা পাঁচ লাখ মানুষের জন্য সহায়তা কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছি।''
গত কয়েক বছরে বিশ্বে একের পর এক বড় মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে, একটি নির্দিষ্ট বৈশ্বিক মানবিক ফান্ড থেকে গাজার জন্য আলাদা করে বড় বরাদ্দ বজায় রাখা দাতা দেশগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক অনুদানকারীদের মনযোগ গাজা থেকে সরে যাচ্ছে। যা এই তহবিলে সংকট তৈরি করেছে বলে মনে করেন স্কাউ, ''খাদ্য সহায়তা কমানোর কারণ এই নয় যে মানুষের প্রয়োজন কমে গেছে। আমরা খাদ্য সরবরাহ করতে পারছি না এমনটাও নয়। এর একমাত্র কারণ হলো আমাদের কাছে তহবিলের অভাব রয়েছে। আগের মতো কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ আমাদের হাতে নেই। যুদ্ধবিরতির শুরুতে আশা ছিল যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে, দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে এবং মানুষ তাদের জীবন নতুন করে গড়ে তুলতে পারবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সবকিছু যেন থমকে গেছে—জীবন যেন এক জায়গায় স্থবির হয়ে আছে। সত্যি বলতে, আমি অনেকের সাথে কথা বলেছি। মনে হচ্ছে তাদের মধ্যে অনেকে যেন গাজাবাসীদের ভুলে গেছে।''
গাজার সীমান্ত দিয়ে কিছু খাদ্যবাহী ট্রাক প্রবেশ করা এবং বেকারি চালু করার ফলে দুর্ভিক্ষকে কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু গাজাবাসীর নিজস্ব উৎপাদন বা অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তারা এখনও সম্পূর্ণভাবে বৈশ্বিক ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল। বাজারে সামান্য কিছু খাবার পাওয়া গেলেও তার দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। কাজ বা আয় না থাকায় নগদ অর্থ দিয়ে খাদ্য কিনে খাওয়ার কোনো সুযোগ তাদের নেই।
জাতিসংঘ আশঙ্কা করছে, খাদ্য সহায়তা কমানো হলে এত দিন ধরে কঠোর পরিশ্রমে দুর্ভিক্ষের যে ঝুঁকি কমানো হয়েছিল, তা আবার চরম ক্ষুধার দিকে ধাবিত হবে। পশ্চিম তীরেও বহু ফিলিস্তিনি খাদ্য নিরাপত্তার সংকটে রয়েছেন। ফলে খাদ্য সহায়তা কমানো হলে পুরো ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডেই সামাজিক ও মানবিক অস্থিতিশীলতা তীব্র হবে।
