কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগের অর্থ জোগাড় করতে ভোটাধিকারবিহীন নতুন ধরনের শেয়ার চালুর পরিকল্পনা করেছে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা। এসব শেয়ারের মালিকেরা কোম্পানির সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভোট দিতে পারবেন না। তবে নতুন শেয়ার ইস্যু করে বিদ্যমান শেয়ারধারীদের ভোটাধিকার ও নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ন রেখেই মূলধন সংগ্রহ করতে পারবে মার্ক জাকারবার্গের নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানটি।
বুধবার (২১ অক্টোবর) তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের সময় মেটা নতুন শেয়ার চালুর পরিকল্পনার বিষয়টি নিশ্চিত করে। এর আগে প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম সেমাফোরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এআই খাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয় মেটাতে ভোটাধিকারবিহীন শেয়ার ছাড়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
মেটার প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) সুসান লি জানান, কোম্পানিটি নতুন এক শ্রেণির ভোটাধিকারবিহীন মূলধনি শেয়ার তৈরি করবে। এসব শেয়ার লভ্যাংশ হিসেবে বিদ্যমান সব শেয়ারধারীর মধ্যে বিতরণ করা হবে।
তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে নতুন শেয়ারগুলো শেয়ারবাজারে লেনদেনযোগ্য হবে। এর ফলে মেটা অতিরিক্ত মূলধন সংগ্রহের সুযোগ পাবে। পাশাপাশি কর্মীদের পারিশ্রমিক দেওয়া, অন্য প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ এবং সাধারণ করপোরেট কার্যক্রম পরিচালনার খরচ মেটাতেও এসব শেয়ার কাজে লাগানো যাবে। একই সঙ্গে কোম্পানির বর্তমান প্রতিষ্ঠাতানির্ভর পরিচালনাকাঠামো বজায় রাখা সম্ভব হবে।
মূলত এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন থেকেই নতুন অর্থায়নের পথ খুঁজছে মেটা। বর্তমানে বিভিন্ন এআই মডেল, ব্যক্তিগত এআই সহকারী এবং সফটওয়্যার নির্মাতাদের জন্য নতুন প্রযুক্তি তৈরিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে মেটার আয় হয়েছে ৬৪ বিলিয়ন বা ৬ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ আয় ২৬ শতাংশ বেশি। তবে একই সময়ে কোম্পানিটির ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের তুলনায় এবার ব্যয় বেড়েছে ৬৮ শতাংশ। ফলে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি, বিশেষ করে এআই খাতে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে বিকল্প অর্থায়নের গুরুত্ব বাড়ছে।
এদিকে মেটার ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর), অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এআর) চশমা এবং সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করা রিয়েলিটি ল্যাবস বিভাগ এখনো লোকসানের মুখে রয়েছে। তবে এ বিভাগের লোকসান কমে আসবে বলে আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি। মেটার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিভাগটির লোকসান ২০২৫ সালের তুলনায় কমে ১৮ থেকে ১৯ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে থাকতে পারে।
এআই খাতে মেটার সাম্প্রতিক উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে মিউজ স্পার্ক, মিউজ গ্লিমার, মিউজ ওয়ান্ডার এবং মিউজ স্পার্ক ওপেন মডেল। এ ছাড়া সফটওয়্যার নির্মাতাদের জন্য মিউজ কোড নামে একটি কোডিং এজেন্ট চালু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। মিউজ স্পার্ক ওপেন মডেলের মূল প্যারামিটার উন্মুক্ত থাকায় বাইরের নির্মাতারা এটি ব্যবহার করার পাশাপাশি নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নয়ন করতে পারবেন।
মেটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মার্ক জাকারবার্গ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় মাত্র দেড় মাসে ১ কোটির বেশি মানুষ মিউজের ব্যক্তিগত এআই এজেন্ট চালু করেছেন। তাঁর দাবি, মিউজের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে এবং এটি প্রায় প্রতিদিনই অ্যাপলের অ্যাপ স্টোরে শীর্ষ অবস্থানে থাকছে।
তবে এআই ব্যবসার সম্প্রসারণের পাশাপাশি আইনি ও নিয়ন্ত্রক চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হচ্ছে মেটাকে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে এ-সংক্রান্ত একাধিক মামলার বিচার আগামী কয়েক মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভোটাধিকারবিহীন শেয়ার চালুর পরিকল্পনা মেটাকে বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণকাঠামো বজায় রেখেই নতুন মূলধন সংগ্রহের সুযোগ দিতে পারে। এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যয় বাড়তে থাকায় প্রতিষ্ঠানটির এই উদ্যোগ ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের অর্থ জোগাড়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হয়ে উঠতে পারে।