• পরিবেশক ও খুচরা বিক্রি পর্যায়ে কমিশন বৃদ্ধির দাবি।
• দাম বাড়াতে চাইছে সরকারি কোম্পানি এলপি গ্যাস লি.।
• ২৯ অক্টোবর গণশুনানি করতে যাচ্ছে বিইআরসি।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
এক মাসের বেশি সময় ধরে সরকার-নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে ১২ কেজির তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার। এই পরিস্থিতির মধ্যে বেসরকারি আমদানিকারক ও বোতলীকরণ কোম্পানির পক্ষ থেকে কয়েকটি স্তরে পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রি পর্যায়েও কমিশন বৃদ্ধির প্রস্তাব জমা পড়েছে নিয়ন্ত্রক এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি)। এমনকি খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেড সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ৮২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ২৩৫ টাকা ৪২ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে। এসব প্রস্তাবের ওপর ২৯ অক্টোবর গণশুনানি করতে যাচ্ছে বিইআরসি।
দেশে প্রতি মাসে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টন এলপিজি ব্যবহার হয়। এর মধ্যে মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ বিক্রি করে সরকারি কোম্পানি এলপি গ্যাস লিমিটেড। চাহিদার বাকিটা ১০ থেকে ১২টি বেসরকারি কোম্পানি আমদানি করে পূরণ করে থাকে। বেসরকারি এলপিজির দাম প্রতি মাসে নির্ধারিত হলেও সরকারি কোম্পানির এলপিজির দাম এক বছরের বেশি সময় ধরে স্থির রয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি সরকারি এলপিজির দাম ৬২ টাকা ১৫ পয়সা হলেও বেসরকারি গ্যাসের দাম দ্বিগুণের বেশি—প্রতি কেজি ১৫৩ টাকা ০৬ পয়সা। দামের এই বৈষম্যের কারণে সরকারি এলপিজি নিয়ে নানা ধরনের অনিয়ম চলে থাকে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসেই বিইআরসির কাছে সরকারি এলপি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব জমা হয়েছিল। সম্প্রতি সেই প্রস্তাব প্রকাশ করা হয়। প্রস্তাবে সৌদি চুক্তি মূল্য (সিপি) অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি ডিলারদের পরিবহন খরচ ২১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৮ টাকা এবং কমিশন ২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫২ টাকার করার কথা বলা হয়েছে।
সরকারি কোম্পানির দেওয়া যুক্তি : প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলা হয়, বিইআরসি ২০২৫ সালের মে মাসে সাড়ে ১২ কেজি এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম ৬৯০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮২৫ টাকা করেছিল। সংস্থাটি গত জানুয়ারি মাসে বেসরকারি গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩৬০ টাকা নির্ধারণ করে। বেসরকারি সিলিন্ডারের তুলনায় বিপিসির সিলিন্ডারের দাম অনেক কম হওয়ায় সরকারি গ্যাস বেসরকারি সিলিন্ডারে ভরে (ক্রস ফিলিং) নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রয় করা হয়। এতে প্রান্তিক পর্যায়ে অনেক গ্রাহক কম দামে সরকারি এলপি গ্যাস পাচ্ছে না। আরেকটি যুক্তিতে বলা হয়, যেহেতু সরকারি শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল) প্রোপেন এবং বিউটেন এর ৩৫: ৬৫ অনুপাতে এলপিজি প্রস্তুত করা হয়, তাই বেসরকারি খাতের মতো সরকারি এলপিজির ক্ষেত্রেও প্রতি মাসে ওই দুই উপাদানের সৌদি সিপি মূল্য ৩৫: ৬৫ অনুপাতে গড় করেই দাম নির্ধারণ করা যুক্তিযুক্ত।
হাইকোর্টের নির্দেশনায় ২০২১ সালের এপ্রিলে প্রথমবারের মতো সরকারি ও বেসরকারি এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। পরে ওই বছরের অক্টোবরে দাম নির্ধারণের পদ্ধতি পরিবর্তন করা হয়। তখন থেকে সৌদি জ্বালানি কোম্পানি আরামকোর প্রতি মাসের চুক্তিমূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করে বেসরকারি এলপিজির দাম নির্ধারণ করছে কমিশন।
পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব বেসরকারিতে: ব্যাংকঋণের সুদহার, পরিবহন খরচ, কারখানা পরিচালনা ও নিরাপত্তার ব্যয় বাড়ার কারণ দেখিয়ে কমিশন বৃদ্ধিসহ গ্যাস বাজারজাত করার বিভিন্ন ধাপে বাড়তি ব্যয়ের সমন্বয় চায় বেসরকারি এলপিজি কোম্পানিগুলো। নতুন প্রস্তাবে তারা কেজিপ্রতি গ্যাস মজুত ও বোতলীকরণের খরচের সঙ্গে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের ওপর মুনাফা বাড়ানোর আবেদন করেছে।
বেসরকারি কোম্পানিগুলোর দেওয়া প্রস্তাবে খরচের হিসাবে ব্যাপক পার্থক্য দেখা গেছে। প্রতি কেজি এলপিজি মজুত ও বোতলজাত করার খরচ ওমেরা এলপিজি ১২ টাকা ২৫ পয়সা, ফ্রেশ এলপিজি ২৫, ডেল্টা এলপিজি ৩০ এবং পেট্রোম্যাক্স এলপিজি সাড়ে ১৯ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে।
ওমেরার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বিইআরসি প্ল্যান্ট পর্যায় পর্যন্ত প্রতি ১২ কেজি রিফিল সিলিন্ডারের জন্য অপারেটর ব্যয় আনুমানিক ২১২ টাকা ধরে। এর বাইরে আছে জাহাজ ভাড়া, ভ্যাট ও গুদাম পর্যন্ত পরিবহন খরচ। অপারেটরদের প্রকৃত ব্যয় আনুমানিক ৪৭৮ টাকা। কোম্পানিটির প্রস্তাবে পরিবেশকের কমিশন ৫০ টাকা অপরিবর্তিত রেখে খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৪৫ থেকে ৮০ টাকা করা হয়েছে। কয়েকটি খাতে ব্যয় কম দেখিয়ে সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ টাকা দাম বাড়ানোর হিসাব দিয়েছে ওমেরা।
মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ এলপিজি মজুত ও বোতলীকরণ খরচ প্রতি কেজিতে ১৬ টাকা ৭৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশকের কমিশন প্রতি কেজিতে ৪ টাকা ১৭ পয়সা থেকে ১০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৩ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৫০ পয়সা করার দাবি জানিয়েছে।
মেঘনার বক্তব্য, ব্যাংকঋণের সুদ বেড়ে বছরে প্রায় ১৫ শতাংশ হয়েছে। পাশাপাশি সিলিন্ডারের নিরাপত্তা পরীক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। বিনিয়োগের ওপর বছরে ২০ শতাংশ মুনাফা বিবেচনারও প্রস্তাব দিয়েছে কোম্পানিটি।
ডেল্টা এলপিজি মজুত ও বোতলীকরণ খরচ প্রতি কেজিতে ১৫ টাকা ৯৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা করার দাবি জানিয়েছে। তারা পরিবেশকের কমিশন প্রতি কেজিতে ৮ টাকা ৩৩ পয়সা এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন ১০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে।
পেট্রোম্যাক্স এলপিজি মজুত ও বোতলীকরণ খরচ প্রতি কেজিতে ১৯ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণের আবেদন করেছে। পাশাপাশি প্রতি কেজিতে ১ টাকা ৫০ পয়সা টার্নওভার কর এবং ৮ টাকা ১২ পয়সা অর্থায়ন ব্যয় বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছে।
এ ছাড়া এম এস তাহের এন্টারপ্রাইজ, মা এন্টারপ্রাইজ, জামাল এজেন্সি এবং উজ্জ্বল ট্রেডার্স নামে চারটি পরিবেশক কোম্পানির আবেদন প্রকাশ করেছে বিইআরসি। আবেদনে প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারে পরিবেশকের কমিশন ৫০ থেকে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৪৫ থেকে ৭০ টাকা করার দাবি রয়েছে।

