নারীদের স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে কমিউনিটি পর্যায় থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত রোগ শনাক্তকরণ, রোগনির্ণয় ও রেফারেল সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার।
আজ রোববার বিশ্ব স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাস উপলক্ষে ঢাকার বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি হাসপাতালে আয়োজিত এক সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার শাখাওয়াত হোসেন বকুল।
ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, বাংলাদেশে স্তন ক্যানসারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রোগটি অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে শনাক্ত হওয়া। সচেতনতার অভাব, সামাজিক সংকোচ, সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করানো এবং সহজলভ্য শনাক্তকরণ ও চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক নারী রোগের অগ্রসর পর্যায়ে চিকিৎসা নিতে আসেন। এর ফলে চিকিৎসা জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে এবং রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও কমে যায়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য শুধু ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা নয়; বরং এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে নারীরা ক্যানসার সম্পর্কে সচেতন হবেন, প্রাথমিক লক্ষণগুলো চিনতে পারবেন এবং রোগের প্রাথমিক পর্যায়েই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা গ্রহণের সুযোগ পাবেন।’
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রচলিত চিকিৎসানির্ভর কাঠামো থেকে প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসুরক্ষা, প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও সময়মতো চিকিৎসানির্ভর একটি আধুনিক জনমুখী ব্যবস্থায় রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে। এই রূপান্তরের অন্যতম অগ্রাধিকার হচ্ছে নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা।
ড. হায়দার জানান, সরকারের পরিকল্পনার আওতায় কমিউনিটি পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধ এবং প্রাথমিক শনাক্তকরণের সক্ষমতা পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারণ করা হবে।
এ উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে নারীদের মধ্যে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি ও সতর্কসংকেত সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিজের স্তনের স্বাভাবিক অবস্থা ও পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকা, প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট এক্সামিনেশন এবং বয়স ও ঝুঁকিভিত্তিক উপযুক্ত স্ক্রিনিং ও ডায়াগনস্টিক সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষভাবে নিয়মিত মাতৃস্বাস্থ্যসেবা ও গর্ভকালীন সেবা বা অ্যান্টিনেটাল কেয়ার (এএনসি) প্যাকেজের সঙ্গে স্তনস্বাস্থ্য মূল্যায়ন, স্তন ক্যানসারের সতর্কসংকেত শনাক্তকরণ এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে জরায়ুমুখের ক্যানসার স্ক্রিনিং ও রেফারেল সেবা যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা তিনি তুলে ধরেন।
এর ফলে নারীরা নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সময়ই ক্যানসার প্রতিরোধ ও প্রাথমিক শনাক্তকরণসংক্রান্ত পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি কমিউনিটি হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিয়িং ওয়ার্কারসহ মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসারের ঝুঁকি, সতর্কসংকেত, প্রাথমিক মূল্যায়ন, সচেতনতা সৃষ্টি এবং যথাযথ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রেফারেলের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
‘ক্যানসার শনাক্তকরণের প্রথম সুযোগটি যেন রাজধানীর কোনো বিশেষায়িত হাসপাতালে নয়, বরং নারীর নিজস্ব কমিউনিটি ও নিকটবর্তী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রেই তৈরি হয়-এটাই আমাদের লক্ষ্য,’ বলেন ড. হায়দার।
অনুষ্ঠানে ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার সম্প্রতি ঘোষিত ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের ৩,৪০০ কোটি টাকা বা ২৫০ মিলিয়ন ইউরোর নতুন বিনিয়োগ উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, এই বিনিয়োগের লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ, রোগনির্ণয় এবং প্রাথমিক চিকিৎসাসেবাকে সমন্বিতভাবে শক্তিশালী করা।
বিশেষ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং জেলা হাসপাতাল পর্যায়ে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল, প্রশিক্ষণ, রোগনির্ণয় সক্ষমতা, চিকিৎসাসেবা ও রেফারেল ব্যবস্থার উন্নয়নে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
স্তন ক্যানসার মোকাবিলায় জনসচেতনতাকে অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করে প্রধান অতিথি পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার শাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, কেবল হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবার সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই রোগের বোঝা কমানো সম্ভব নয়। এজন্য নারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি দেশব্যাপী টেলিভিশন, বেতার, সংবাদপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সমন্বিত সচেতনতামূলক প্রচারণা পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নারী সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবক এবং সামাজিক নেতৃত্বের মাধ্যমে সরাসরি আন্তব্যক্তিক যোগাযোগভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, প্রত্যেক নারীকে নিজের স্তনের স্বাভাবিক গঠন ও পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। স্তনে অস্বাভাবিক চাকা বা গিঁট, আকৃতির পরিবর্তন, ত্বকে অস্বাভাবিক পরিবর্তন কিংবা স্তনবৃন্ত থেকে অস্বাভাবিক নিঃসরণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। তবে শুধু নিজে স্তন পরীক্ষা করা নিয়মিত চিকিৎসাভিত্তিক স্ক্রিনিংয়ের বিকল্প নয়।
‘নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা কোনো বিচ্ছিন্ন স্বাস্থ্য খাতের কর্মসূচি নয়; এটি আমাদের জাতীয় উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির একটি মৌলিক অগ্রাধিকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যেখানে আর্থিক সামর্থ্য, সামাজিক অবস্থান কিংবা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কোনো নারী প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হবেন না,’ যোগ করেন পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বিশ্ব স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাস উপলক্ষে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রাথমিক শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
হাসপাতালের পরিচালকের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
