দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বঙ্গোপসাগরে তেল–গ্যাস সম্পদ অনুসন্ধানে বিদেশি বিনিয়োগ টানার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২৬টি সমুদ্র ব্লক অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের পর চীনের দুটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সিনোপেক ও সিএনওওসি ইন্টারন্যাশনাল এবং তুরস্কের টিপিএও দরপত্রের নথি কিনেছে। এখন পর্যন্ত ১০টি কোম্পানি আগ্রহ দেখালেও দরপত্রে অংশ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিক প্যাকেজ কিনেছে তিনটি কোম্পানি। অন্যদিকে এক্সনমবিল, বিপি ও এনির মতো বড় আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিকে দরপত্রে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। আগের দরপত্রগুলোতে প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ায় এবারও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পর্যাপ্ত দরদাতা পাওয়া যাবে কি না সংশয় থাকলেও বড় কোম্পানিগুলোর আগ্রহ নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।
সূত্র জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে তেল–গ্যাস অনুসন্ধানে গত ২৪ মে দ্বিতীয়বারের মতো আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে। বঙ্গোপসাগরের অগভীর সমুদ্রের ১১টি ও গভীর সমুদ্রের ১৫টিসহ মোট ২৬টি ব্লক এ দরপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দরপত্র জমা দেওয়ার নির্ধারিত শেষ সময় আগামী ৩০ নভেম্বর। দ্বিতীয় দরপত্রে নতুন উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তির (পিএসসি) শর্তে পরিবর্তন এনে বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমাকে আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।
এই দরপত্রে সাড়া দিয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর চীনের সিনোপেক তথ্য প্যাকেজ, দরপত্রের আনুষ্ঠানিক নথি এবং বিশেষায়িত ডেটা প্যাকেজ কিনেছে। এর আগে ১৭ আগস্ট সিএনওওসি ইন্টারন্যাশনাল এবং ২৩ জুলাই তুরস্কের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান টিপিএও দরপত্রের আনুষ্ঠানিক প্যাকেজ কেনে। তথ্য প্যাকেজের পাশাপাশি দরপত্রের নথি কেনায় তেল–গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্রে বিশ্বখ্যাত এসব কোম্পানির অংশগ্রহণ অনেকটা নিশ্চিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্লকের ভূতাত্ত্বিক গঠন, সিসমিক তথ্য, সম্ভাব্য তেল–গ্যাসের মজুত এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা পর্যালোচনা করেই সাধারণত কোম্পানিগুলো বিনিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, এই দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের সম্ভাবনার পাশাপাশি দেশের গ্যাসের ঘাটতি, ক্রমবর্ধমান আমদানিনির্ভরতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমুদ্রের নিজস্ব সম্পদ অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দরপত্রে শর্ত সহজ করে অনুসন্ধানে বিনিয়োগের আগ্রহ তৈরি, অনুসন্ধানের ঝুঁকি, সম্ভাব্য মজুত, উৎপাদন ব্যয়, বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার সুযোগের ব্যাপারেও কোম্পানিগুলোকে আশ্বস্ত করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা আজাদীকে বলেন, এখন পর্যন্ত ১০টি কোম্পানি তথ্য প্যাকেজ কিনেছে। তবে আনুষ্ঠানিক দরপত্রের নথি কিনেছে তিনটি কোম্পানি। তিনি বলেন, আগামী দিনগুলোতে আরও কয়েকটি বড় জ্বালানি কোম্পানি দরপত্রের নথি কিনবে। এ বিষয়ে এঙনমবিল, বিপিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও আলোচনা চলছে।
তথ্য প্যাকেজ কেনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে বেরিঞ্জিয়া পাওয়ার বাংলাদেশ লিমিটেড, ক্রিসএনার্জি, পিইএএল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, ওনোডা ইনকরপোরেটেড, রাইস্ট্যাড এনার্জি, ম্যাঙ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড এবং সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ইমপ্রেশন ভেঞ্চারস এজি। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনোটি অনুসন্ধান ও উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই করতে পারে, আবার কোনোটি প্রকৌশল, অবকাঠামো বা গবেষণা ও পরামর্শসেবা সংক্রান্ত কাজের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখবে।
আন্তর্জাতিক বড় কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশ কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে যোগাযোগ জোরদার করছে জানিয়ে সূত্র বলেছে, ৩০ সেপ্টেম্বর এঙনমবিল, বিপি ও এনির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়েছে। দরপত্র আহ্বানের পর যুক্তরাষ্ট্রের এঙনমবিল পেট্রোবাংলার সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং অনলাইন বৈঠকে অংশ নেয়। প্রতিষ্ঠানটি আগের দরপত্রের সময় একটি ডেটা প্যাকেজ কেনার কথা জানিয়েছিল। এবারও প্রয়োজনীয় নথি কেনার ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানটি আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
ব্রিটিশ জ্বালানি কোম্পানি বিপিও বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধানে আগ্রহ দেখিয়েছে। গত জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা পেট্রোবাংলার সঙ্গে অনলাইন বৈঠক করেন। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সমুদ্র ও গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানের অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন মারফি অয়েল, ব্রাজিলের পেট্রোব্রাস এবং কুয়েত ফরেন পেট্রোলিয়াম এঙপ্লোরেশন কোম্পানির (কুফপেক) মতো প্রতিষ্ঠানকে দরপত্রে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশের নতুন দরপত্রের শর্তগুলো আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করবে উল্লেখ করে সূত্র জানায়, ২০১২ সালের দরপত্রে তিনটি অগভীর সমুদ্র ব্লক ও একটি গভীর সমুদ্র ব্লক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অনুসন্ধানের অগ্রগতি ও বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় নতুন করে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রয়োজন দেখা দেয়। ২০২৬ সালের দরপত্রে সংশোধিত উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তির মাধ্যমে কোম্পানিগুলোর জন্য আর্থিক ও বাণিজ্যিক শর্ত সহজ করে কিছুটা প্রতিযোগিতামূলক করা হয়েছে।
নতুন চুক্তির কাঠামোয় অনুসন্ধানের প্রাথমিক মেয়াদ ছয় বছর এবং প্রয়োজনে আরও তিন বছর বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যয় পুনরুদ্ধার, উৎপাদন ভাগাভাগি এবং গ্যাসের মূল্য নির্ধারণের শর্তেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে এসব শর্তের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা গেলে তারা দরপত্রে অংশগ্রহণ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
পেট্রোবাংলার ওই কর্মকর্তা বলেন, দরপত্রে আগ্রহ বাড়াতে তথ্য প্যাকেজের দাম কমানো এবং জমা দেওয়ার সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তথ্য প্যাকেজের মূল্য কমানোর প্রস্তাব জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ৩০ নভেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমা আরও কয়েক মাস বাড়ানোর আলোচনা চলছে।
বিশ্বের বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলে সমুদ্রে তেল–গ্যাস অনুসন্ধানের বিপুল বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও গভীর সমুদ্রে কাজ করার অভিজ্ঞতার বিষয়ে পেট্রোবাংলা উপকৃত হবে উল্লেখ করে সূত্র জানিয়েছে, বিশেষ করে গভীর সমুদ্রের ১৫টি ব্লকে অনুসন্ধানের জন্য উন্নত প্রযুক্তি, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং বড় ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা প্রয়োজন। অভিজ্ঞ এবং বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানি ছাড়া এসব ব্লকে অনুসন্ধান সম্ভব নয়।
দরপত্র জমা, ব্লক বরাদ্দ, চুক্তি স্বাক্ষর, অনুসন্ধান কূপ খনন এবং বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য মজুত আবিষ্কারসহ অনুসন্ধানের প্রতিটি ধাপে সময় ও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। এসব পেট্রোবাংলা বা বাপেঙের পক্ষে সম্ভব হবে না উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে কতটি কোম্পানি দরপত্র জমা দেয় এবং তাদের মধ্যে কতটি গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানে আগ্রহী হয় এখন সেটিই দেখার বিষয়।
