দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। সীমান্তজুড়ে দক্ষিণ কোরিয়াবিরোধী প্রচারের জন্য বিশালাকার মাইক পুনরায় চালু করার ঘোষণা দিয়েছেন উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকলে দেশটিকে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে কিম ইয়ো জং জানান, চলতি অক্টোবরের শেষ নাগাদ সীমান্তের পুরো এলাকায় দক্ষিণ কোরিয়াবিরোধী মাইকগুলো সক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে বুধবার রাতে জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে সীমান্তবর্তী সেনা দুর্গ ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পরিদর্শন করেন তিনি। এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে সীমান্তে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করার বার্তা দিয়েছে পিয়ংইয়ং।
কিম ইয়ো জংয়ের অভিযোগ, উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত সামরিক ইউনিটগুলো ইতোমধ্যে সীমান্তে নতুন অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার সেনারা সীমান্ত এলাকায় উসকানিমূলক বার্তা প্রচার করছে এবং বিভিন্ন স্থানে সতর্কতামূলক ফাঁকা গুলি ছুড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। এসব কর্মকাণ্ডকে উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরে কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দেন কিম ইয়ো জং।
তিনি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার ছোড়া সতর্কতামূলক গুলিতে উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ড বা কোনো সেনাসদস্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশটির বাহিনী বিনা দ্বিধায় কঠোর ব্যবস্থা নেবে। তাঁর বক্তব্যে দুই দেশের সীমান্তে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে দক্ষিণ কোরিয়া নিজেদের পদক্ষেপকে আইনসম্মত ও আত্মরক্ষামূলক বলে বর্ণনা করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা ও একীভূতকরণ মন্ত্রণালয় উত্তর কোরিয়াকে আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর ভাষ্য, জাতিসংঘ কমান্ডের সহযোগিতায় অসামরিকীকৃত সীমান্ত এলাকায় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার প্রতিক্রিয়াকে তারা এসব পদক্ষেপের কার্যকারিতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে। একই সঙ্গে পিয়ংইয়ং হুমকি বাস্তবায়ন করলে সিউলও পরিস্থিতি অনুযায়ী উপযুক্ত জবাব দেবে বলে জানিয়েছে।
এই পরিস্থিতি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ংয়ের দুই দেশের মধ্যকার বৈরিতা কমানোর প্রচেষ্টাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি সীমান্তে উত্তেজনা প্রশমনে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া গত বছর সীমান্তের মাইক থেকে প্রচার বন্ধ করে এবং সেগুলো সরিয়ে ফেলার পদক্ষেপ নেয়। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে উত্তর কোরিয়াও প্রচার বন্ধ রেখেছিল।
দুই কোরিয়ার মধ্যে প্রচারযুদ্ধের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। দক্ষিণ কোরিয়া সীমান্তের মাইকে জনপ্রিয় সংগীত, সংবাদ ও বিভিন্ন বার্তা প্রচার করত। এসব প্রচার উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বের অসন্তোষের কারণ ছিল। অন্যদিকে পিয়ংইয়ংও পাল্টা প্রচারের মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে বক্তব্য তুলে ধরত।
১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত চলা কোরীয় যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতির ভিত্তিতে দুই দেশ পৃথক রয়েছে। তাদের মধ্যবর্তী অসামরিকীকৃত অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্র। সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার, মাইন স্থাপন এবং কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ আরও বেড়েছে। সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার দুই সেনা গুরুতর আহত হওয়ার পর সিউল এ ঘটনার জন্য উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করলেও পিয়ংইয়ং অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কিম ইয়ো জংয়ের ঘোষণার অর্থ এই নয় যে সীমান্তের মাইকগুলো তাৎক্ষণিকভাবে চালু হয়ে যাচ্ছে। তবে তাঁর বক্তব্য দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারের সামনে কূটনৈতিক ও সামরিক—দুই দিক থেকেই নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। দুই দেশের মধ্যে সংলাপের পরিবেশ তৈরি না হলে সীমান্তে প্রচারযুদ্ধ ও পাল্টাপাল্টি হুমকি আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
-20261022072651.jpg&w=1440&q=75)