সিক্যুয়েলের ভবিষ্যৎটাই সবসময়ে আশঙ্কার এক কঠিন পথ ধরে চলে। ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রথম পর্ব ঘিরে শিল্পের যে আদিম উন্মাদনা তৈরি হয়, উঠে যায় সাফল্যের তুঙ্গে। সেটাই সিক্যুয়েলে এসে প্রায়শই ম্লান হয়ে যায় দর্শকের স্মৃতি আর তুলনার করাল থাবায়। প্রতি পদে পদে চলে আসে তুলনা। সে অভিনয় হোক, পরিচালনা কিংবা স্ক্রিপ্ট। ভারতীয় সিনেমায় এরকম ভুরি ভুরি উদাহরণ হাজির। রামগোপাল ভার্মার ‘সরকার’-এর সেই ধ্রুপদী মহিমা কি ধরে পড়েছিল ‘সরকার রাজ’-এ? কিংবা ‘দৃশ্যম’-এর সেই শ্বাসরুদ্ধকর চমক কি, ‘দৃশ্যম-টু’তেও ঠিক ততটাই অমলিন ছিল? আব্বাস মস্তানের ‘রেস’-এর বাণিজ্যিক থ্রিলারের সাসপেন্স দেখার পর যে মুগ্ধতা তৈরি হয়েছিল, সেই মুগ্ধতা সত্যিই কি ছিল ‘রেস-টু’ তে?
প্রথমার্ধেই কখন যে মনে মনে আপনি ‘ডাকাত’ বিক্রম প্রামাণিকের জন্য নিজের অজান্তেই ইস্টদেবতাকে স্মরণ করতে শুরু করে দেবেন, বুঝতেই পারবেন না।
বাংলায় ফিরে আসি। সবচেয়ে বড় উদাহরণ তো ‘উইন্ডোজ হাউস’-এই আছে। ‘রক্তবীজ’ আর ‘রক্তবীজ ২।’ আসলে ফ্র্যাঞ্চাইজিতে প্রথম ছবির সাফল্যের বিশালতা এমন এক দৈত্যাকার ছায়া ফেলে যে, সিক্যুয়েল ভালো হলেও, প্রথম ছবির বিশালত্বের সেই মাত্রাটা স্পর্শ করা রীতিমতো দুঃসাহসিক অভিযানের মতো হয়ে ওঠে। এরকম সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে বুধবার অ্যাক্রোপলিস মলে উইন্ডোজের তরফে ‘বহুরূপী দ্য গোল্ডেন ডাকু’র ‘ক্লোজডোর’ প্রদর্শনীতে ঢুকেছিলাম। দেখাই যাক না, ডাকাতির গল্পকে আর কত ফরম্যাটে ভেঙে নতুন মোড়কে ফেলা যায়। এটাই ছিল লক্ষ্য।
এই সিনেমার ডিওপি, অনিমেশ ঘোড়ুই। আলো ঠিক হল, না কি ফ্রেমটা ঠিক আছে? কোনও শটটা কি একটু লো অ্যাঙ্গলে নিলে ভালো হত? এসব দেখার বা বোঝার সময় কোথায়? একটা করে সিন সরে সরে যাচ্ছে, আর পরের সিনের জন্য অধীর অপেক্ষা। তাহলে কী হবে? তাহলে কী হবে? প্রথমার্ধেই কখন যে মনে মনে আপনি ‘ডাকাত’ বিক্রম প্রামাণিকের জন্য নিজের অজান্তেই ইস্টদেবতাকে স্মরণ করতে শুরু করে দেবেন, বুঝতেই পারবেন না। শেষ পর্যন্ত বিক্রম প্রামাণিক ধরা পড়বে না তো? দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ ছেড়ে আপনি ততক্ষণে ‘ডাকাত’-এর দলে। চিত্রনাট্য আর শিবপ্রসাদের অভিনয়ের জোরে এখানেই ‘দ্য গোল্ডেন ডাকু’র স্বার্থকতা। আর এখানেই সিক্যুয়েল হয়েও ‘বহুরূপী’কে ছাপিয়ে এগিয়ে গিয়েছে ‘দ্য গোল্ডেন ডাকু’।
ইচ্ছে করেই, চোর-পুলিশের দ্বন্দ্বের গল্পটা বলছি না। আগাম বলে দিলে হলে গিয়ে আপনার দেখার উত্তেজনাটাই কমে যাবে। যেরকম বলছি না, ভারতীয় সিনেমা জগতের এক প্রবাদপ্রতীম ব্যাক্তিত্বর শেষ দৃশ্যে অবতীর্ণ হয়ে হলের হাততালি কুড়নো। কিন্তু একটা কথা বলতেই হচ্ছে, এবার থেকে শিবপ্রসাদ অভিনয় করলে, সহ-অভিনেতাদের কিন্তু যথেষ্ট চাপ আছে।
সফল চিত্রনাট্য সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা একটা কথা বলেন। দুই অর্ধে মোট চারভাগে ভাগ করা হয় সফল চিত্রনাট্যকে। প্রথমার্ধে, প্রথম ভাগের চিত্রনাট্য এমন টান টান হবে, যে আপনাকে প্রথমার্ধের চিত্রনাট্যের দ্বিতীয় ভাগ দেখার জন্য ছটফট করতে হবে। আর ‘বহুরূপী’র সিক্যুয়েল দেখতে গিয়ে বিরতির সময় মনেই হবে না, বাইরে গিয়ে কোল্ড ড্রিঙ্কস আর পপকর্ন কিনে সময় নষ্ট করি। সিটে ফিরতে দেরি হলে, যদি দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হয়ে যায়? এখানেই নন্দিতা রায় আর শিবপ্রসাদের চিত্রনাট্য আর সংলাপের অপার মহিমা। আপনি মুহূর্তের জন্য চোখের পলক ফেলতে পারবেন না। সেই সামান্য ক্ষনেও যদি কোনও মুহূর্ত মিস হয়ে যায়। ইচ্ছে করেই, চোর-পুলিশের দ্বন্দ্বের গল্পটা বলছি না। আগাম বলে দিলে হলে গিয়ে আপনার দেখার উত্তেজনাটাই কমে যাবে। যেরকম বলছি না, ভারতীয় সিনেমা জগতের এক প্রবাদপ্রতীম ব্যাক্তিত্বর শেষ দৃশ্যে অবতীর্ণ হয়ে হলের হাততালি কুড়নো। কিন্তু একটা কথা বলতেই হচ্ছে, এবার থেকে শিবপ্রসাদ অভিনয় করলে, সহ-অভিনেতাদের কিন্তু যথেষ্ট চাপ আছে। যে কোনও সময়, যে কোনও অভিনেতাকে তুখোড় অভিনয়ে খেয়ে ফেলতে পারেন। আর শুধু তো শিবপ্রসাদ নামক এক মহীরূহ অভিনেতার চাপ নয়। বহুরূপী সিরিজের প্রথম ছবিতে পুলিশের চরিত্রে আবীর চট্টোপাধ্যায় এতটাই সফল ছিলেন যে, প্রতি ইঞ্চিতে তাঁর জুতোয় পা গলানো ‘গোল্ডেন ডাকু’তে যীশুর জন্য তা রীতিমতো কঠিন স্পেল ছিল। সঙ্গে অবশ্যই ঝিমলি, কৌশানী। সত্যি বলতে কী, বহুরূপী সিরিজে শিবু-কৌশানির প্রেমময় দৃশ্যগুলিতে এমনভাবে বাংলার মাটির সোঁদা গন্ধ লেগে থাকে যে, বাঙালির বড় আপন মনে হয়। আর এখানেই শিবু-নন্দিতার ইউএসপি। তবে ‘বহুরূপী’র সিক্যুয়েলে কিন্তু রাজনীতির পালাবদলের কথাও বলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে রাজনীতির ছবি না হয়েও ‘দ্য গোল্ডেন ডাকু’ ভীষণভাবেই রাজনৈতিক। আর তা বোঝার জন্য পুজোর আবহে সিনেমাটিকে আপনাকে দেখতেই হবে। শুধু গানগুলোই যা বহুরূপী সিরিজের প্রথম সিনেমার মতো হৃদয়ে বাঁধল না। বাকিটা, পয়সা উসুল।
