রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) গবেষণা মাঠ যা পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠ হিসেবে পরিচিত, সেখানে সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। পরে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্মারকলিপি দেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ঢাকার ফুসফুস শেরেবাংলা নগরের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। এ ছাড়াও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জোর পূর্বক গ্রহণকৃত জমি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে ফিরিয়ে না দিয়ে সেখানে সচিবালয়ের মতো বৃহৎ স্থাপনা গঠনের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের ঢাকার জন্যও ভুল হবে বলে জানান তারা।
মানববন্ধনে অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠটি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সম্পত্তি। ১৯৩৮ সালে শের-এ-বাংলা এ কে ফজলুল হকের নিজের হাতে গড়া এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্যার ৩০ একর জমি স্বৈরাচার এরশাদ সরকার বাণিজ্য মেলার জন্য অস্থায়ী ভাবে কেড়ে নেয়। শিক্ষা ও গবেষণাকে তারা তখন প্রাধান্য দেয়নি। কিন্তু শিক্ষাবান্ধব নতুন সরকারের এমন দৃষ্টান্ত তৈরি করুক এমন কেউ চায় না। পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাঠটি ফিরে পাওয়ার আশা করেছিলেন তারা। কিন্তু আমলারা সরকারকে ভুল বুঝিয়ে সেখানে সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনা করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ওই মাঠে সচিবালয় স্থাপন করা হলে রাজধানীর পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি কৃষি গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টির জমির সংকট আরও বাড়বে। তাই মাঠটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে মাঠটি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখন শুনছি, আমলারা সেখানে সচিবালয় স্থাপনের পরিকল্পনা করছেন। ফলে ক্লাস রুম ছেড়ে আমাদের রাস্তায় নামতে হয়েছে। আমাদের দাবি মেনে নেওয়া না হলে পরবর্তী সময়ে আরও কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হবে।’
ঢাকা শহরে বছরে ১ কোটি ৩৩ লক্ষ টনেরও বেশি কার্বন নিঃসরণ হয়। যা এ শহরের আবহাওয়া পরিবর্তন এবং বাসিন্দাদের বিভিন্ন রোগের কারণ। এই কার্বনের সিংক হিসেবে জিয়া উদ্যান, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বোটানিক্যাল গার্ডেনের মত সবুজ অঞ্চল কাজ করে। শুধু শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ই বছরে ১৫০ থেকে ২০০ মেট্রিক টন কার্বনের সিংক হিসেবে কাজ করে। এর ফলে ঢাকার পরিবেশ কিছুটা স্থিতিশীলত থাকে। কিন্তু এর মাঝে এমন বিশাল স্থাপনা, এর জন্য বাড়তি গাড়ির চাপ এবং ফিডার রোডের পিচ ঢালা রাস্তার নির্মাণে এসকল কার্বন সিংক নষ্ট হবে এবং এ অঞ্চলের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়ে যাবার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মানববন্ধন কর্মসূচির পরে জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শেকৃবি অধ্যাপক ড এম সালাহউদ্দিন এম চৌধুরী বলেন, ‘এই মাঠটি কৃষি গবেষণার কাজে ব্যবহার করলে যেমন পরিবেশও উপকৃত হবে, ঠিক তেমন দেশও উপকৃত হবে। উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের দেশের প্রশাসনিক অঞ্চলকে প্রসার করা প্রয়োজন। এভাবে একটা "বামন ঢাকা" গড়ে তুললে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটা সুন্দর ঢাকা আমরা রেখে যেতে পারব না। পূর্বাচল বা উত্তরায় বিশাল ফাকা স্থান পড়ে আছে, প্রশস্ত ফিডার রোডও আছে। সরকার সে সকল জায়গায় সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’
সচিবালয় এখানে আসলে জিয়া উদ্যানের সৌন্দর্য নষ্ট, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধির সম্মান ও সৌন্দর্য নষ্ট, আগারগাঁও এ থাকা দেশের শীর্ষ স্থানীয় হাসপাতাল সমূহের রোগী ব্যবস্থাপনায় সমস্যা, আরও হাজার হাজার গাড়ির চলাচলের রাস্তা নির্মাণ, জানযট তৈরী, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাত কমে আসা, ঢাকা আরও অনুপযুক্ত হয়ে ওঠা সহ অনেক সমস্যার কথা তুলে ধরেন তারা। এ ছাড়াও এ মাঠের গবেষণের বিস্তার করাটাই ঢাকা ও দেশের জন্য সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত সিদ্ধান্ত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাজধানী শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায় থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদান রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থী সহ সকলেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানে কাছে তার মা এর মতো দূরদর্শী এবং শিক্ষানুরাগী বিবেচনার আশায় আছেন। যেন সরকার এই নীতিগত সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে কৃষি গবেষণায় এই মাঠের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারের সুযোগ দেয়।
এছাড়াও ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত উপমহাদেশের প্রাচীন কৃষি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে শের-এ-বাংলা একে ফজলুল হকে নাম খচিত ফলক, যা তিনি নিজে উদ্বোধন করেছিলেন। এটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ঐতিহাসিকভাবেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতীয়মান করে বলে জানান বক্তারা।
সংবাদ সম্মেলন শেষে আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদল তেজগাও এ অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্মারকলিপি প্রদান করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন এর চাওয়া জমিটি স্বৈরাচার সরকার গণভবনের নিরাপত্তার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়কে হস্তান্তর করেনি। পারব বিভিন্ন সময় আন্দোলনে গেলে গবেষণা মাঠটি ফিরিয়ে দেয়ায় গড়িমসি করেছে ইন্টেরিম সরকার। এর আগে গত ৫ ফেব্রুয়ারি পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে ‘টেক ব্যাক শেকৃবি ল্যান্ড’ শীর্ষক কর্মসূচি পালন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাবেক শিক্ষার্থীরা। ওই কর্মসূচি থেকে মাঠটি দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
তাদের দাবি, কৃষি গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় জমির সংকটে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
