শরতের নীল আকাশ, প্যান্ডেলে ঢাকের বাদ্যি আর আলোর রোশনাইয়ে যখন চারপাশে উমাকে বরণ করার প্রস্তুতি তুঙ্গে, তখন সিউড়ির বড়বাগানের দাসবাড়িতে দুর্গাপুজো ঘিরে অন্য এক আবহ। এখানে দেবী আসেন, পুজো হয়, ঢাকের আওয়াজও ওঠে। কিন্তু বাড়ির চৌহদ্দি পেরিয়ে বাইরের আলোয় আসেন না তিনি। কয়েক শতাব্দীর বিশ্বাস, সামাজিক বাধা আর এক বুক শোকের স্মৃতি বুকে নিয়ে আজও অন্দরমহলেই পূজিত হন দাস পরিবারের দুর্গা, বরদাসুন্দরী।
এই পুজোর শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের অনেক গভীরে। ১৭৪২ সালে নদিয়ার কামারহাটি গ্রামে ব্যবসায়ী মোহন দাস নিজের হাতে দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন। কিন্তু অব্রাহ্মণ হয়ে দেবীর আরাধনা করার অপরাধে তৎকালীন ব্রাহ্মণ সমাজের বাধার মুখে পড়তে হয় মোহন দাসকে। অব্রাহ্মণ হয়েও কীভাবে পুজোর আয়োজন? একেবারে হইহই পড়ে যায়। শেষমেশ পুজো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন মোহনবাবু। যদিও এর অনেক পড়ে তাঁর পুত্র বৈকুণ্ঠনাথ এবং পুত্রবধূ বরদাসুন্দরী নবদ্বীপের এক বাগানবাড়িতে ফের পুজো শুরু করেন। পরিবারের বধূর নামেই দেবী পরিচিত হন বরদাসুন্দরী নামে।
কিন্তু ব্রিটিশ আমলে শুরু হওয়া এই পুজোর ইতিহাসে নেমে এসেছিল এক মর্মান্তিক সন্ধ্যা। জানা যায়, একবার ষষ্ঠীর দিন মৃত্যু হয় পুরোহিতের। এহেন পরিস্থিতিতে বৈকুণ্ঠনাথ নিজেই পুজোর দায়িত্ব সামলান। পরে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের আপত্তিতে ফের পুরোহিতের হাতে পুজোর ভার যায়। তার কয়েক বছর পর সন্ধিপুজোর মুহূর্তেই মৃত্যু হয় বৈকুণ্ঠনাথের কন্যা নীলাবতীর। আনন্দের উৎসব মুহূর্তে ডুবে যায় শোকে। সেই বছর দশমীতে কালো কাপড়ে দেবীর মুখ ঢেকে গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল প্রতিমা। দেবী যেন আর দিনের আলো না দেখেন, সেই আকুতিই মিশে ছিল ওই আচ্ছাদনে। তারপর বন্ধ হয়ে যায় নবদ্বীপের পুজো।
দীর্ঘ বিরতির পরে ১৯৫৮ সালে বৈকুণ্ঠনাথের প্রপৌত্র কৃষ্ণগোবিন্দ দাস সিউড়িতে আসেন। ১৯৯৫ সালে স্বপ্নাদেশ পেয়ে তাঁর পুত্র সমীরণ দাস ফের শুরু করেন দুর্গাপুজো। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গিয়েছে ৩১ বছর। আজও একচালার প্রতিমা গড়া থেকে রং করা, ডাকের সাজে সাজানো, পুজোর আচার পালন—সবই নিজের হাতে করেন সমীরণ। পাশে থাকেন স্ত্রী প্রশমিতা ও পুত্র সমীপেষু। পরিবারের সদস্যরাই পুরোহিত, তাঁরাই আরাধক। সমীরণ ও প্রশমিতা জানান, অতীতের সেই শোকের স্মৃতি আজও তাঁদের পুজোর নিয়মে জড়িয়ে রয়েছে। তাই রাস্তা থেকে দূরে বাড়ির ভিতরে থাকা পুকুর থেকেই তোলা হয় ঘট, কলাবউ স্নান ও বিসর্জন। বাইরের আলোয় আনা হয় না প্রতিমাকে। আসলে দাসবাড়ির দুর্গাপুজো শুধু দেবীর আরাধনা নয়, কয়েক প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা এক পরিবারের আবেগের ইতিহাস। যেখানে উৎসবের উজ্জ্বলতার চেয়েও গভীর হয়ে রয়েছে হারানোর যন্ত্রণা, আর সেই যন্ত্রণার মধ্যেই নীরবে জেগে রয়েছে বিশ্বাসের প্রদীপ।
